বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৬
২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাত নিরসনে ভারতের তিন দফা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০২:২৮ পিএম

রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাত নিরসনে ভারতের তিন দফা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব
ছবি : Collected

ইউরোপের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গত চার বছর ধরে চলমান রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী এবং ধ্বংসাত্মক সংঘাত নিরসনে এবার আনুষ্ঠানিকভাবে এক ঐতিহাসিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র ভারত।

 

দীর্ঘ এই যুদ্ধ পরিস্থিতি সমগ্র বিশ্বের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং মানবিক মর্যাদাকে যখন এক চরম অনিশ্চয়তা ও গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে, ঠিক তখনই নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে বিবদমান দুই রাষ্ট্র রাশিয়া এবং ইউক্রেনকে একটি সুনির্দিষ্ট যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

 

এই আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানোর মধ্য দিয়ে ভারত প্রথমবারের মতো পূর্ব ইউরোপের এই দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংকটের সমাধানে সরাসরি এবং কার্যকরভাবে যুক্ত হলো, যা বর্তমান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

ভারত তার চিরচেনা জোটনিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতির ওপর ভিত্তি করে উভয় দেশের সাথেই একটি সম্মানজনক ও গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানোর ঐকান্তিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে দেশটির শীর্ষস্থানীয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-নিউজ ১৮ সম্প্রতি তাদের একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই যুগান্তকারী কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা প্রকাশ্যে এনেছে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং মন্ত্রণালয়ের বিশ্বস্ত সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই শান্তি প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে গত সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফরে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ গমন করেছিলেন।

 

সেখানে অবস্থানকালে তিনি ইউক্রেনের শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা, সামরিক কৌশলবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে রাশিয়ার সাথে চলমান সর্বগ্রাসী যুদ্ধ বন্ধ এবং একটি সম্ভাব্য সম্মানজনক যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে অত্যন্ত গভীর ও ফলপ্রসূ আলোচনা সম্পন্ন করেন।

 

কিয়েভে অত্যন্ত সফল একটি আলোচনা শেষে তিনি পরবর্তীতে এই একই এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যু নিয়ে মস্কোর শীর্ষ রুশ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও ধারাবাহিক ও নিবিড় আলোচনা চালিয়েছেন, যার চূড়ান্ত ফলশ্রুতি হিসেবেই বর্তমান এই নতুন এবং যুগান্তকারী যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোর মুখ দেখেছে।

 

ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত এই যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবটি মূলত একটি তিন দফাভিত্তিক সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অত্যন্ত সুকৌশলে এবং দূরদর্শিতার সাথে যুদ্ধের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকগুলোকে প্রশমিত করার রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে।

 

এই প্রস্তাবের প্রথম এবং অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্র এবং অন্যান্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও বেসামরিক অবকাঠামোগুলোর ওপর উভয় পক্ষের সব ধরনের সামরিক হামলা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।

 

প্রস্তাবের দ্বিতীয় ধাপে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক নৌপথ কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলো ব্যবহার করে বিশ্ববাজারে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য এবং জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ পুনরায় সচল ও অব্যাহত রাখার ওপর বিশেষ জোর প্রদান করা হয়েছে।

 

এরপর প্রস্তাবের সর্বশেষ এবং তৃতীয় ধাপে, কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে চলাচলকারী সকল ধরনের সাধারণ, পণ্যবাহী ও বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর যেকোনো প্রকার সামরিক আক্রমণ, অবরোধ বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা থেকে উভয় পক্ষকে কঠোরভাবে বিরত থাকার কথা বলা হয়েছে।

 

এই তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ভারত মূলত একটি ভারসাম্যপূর্ণ শান্তির পথ তৈরি করতে চাইছে। নয়াদিল্লির প্রণীত এই অভিনব প্রস্তাবটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এর মাধ্যমে চলমান যুদ্ধের একাধিক ধ্বংসাত্মক দিককে একই সঙ্গে এবং একটিমাত্র সুনির্দিষ্ট কাঠামোর আওতায় এনে সমাধানের আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে।

 

এতদিন ধরে অবিরাম গোলাবর্ষণ ও নিরবচ্ছিন্ন যুদ্ধের কারণে ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ বেসামরিক অবকাঠামোগুলো যেমন- বৃহৎ বিদ্যুৎ কেন্দ্র, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্রমাগত ভয়াবহ ধ্বংসের সম্মুখীন হচ্ছিল, যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে চরম দুর্বিষহ করে তুলেছিল।

 

অন্যদিকে, সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ার কারণে বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের প্রান্তিক ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে খাদ্যশস্য এবং জ্বালানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। ভারতের এই সমন্বিত প্রস্তাবটি একই সঙ্গে এই দুই ভিন্ন মাত্রার সংকট-অর্থাৎ একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বেসামরিক অবকাঠামোগত সুরক্ষা এবং সমগ্র বিশ্বের জন্য অত্যাবশ্যকীয় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের নিরাপত্তা-উভয়টিকেই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়েছে, যা একে একটি অনন্য কূটনৈতিক দলিলে পরিণত করেছে।

 

এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে এই সর্বগ্রাসী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত প্রায় সাড়ে চার বছরের দীর্ঘ পরিক্রমায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন প্রভাবশালী সদস্য যেমন মিশর, তুরস্ক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার মস্কো ও কিয়েভকে যুদ্ধবিরতি বা শান্তি চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছে।

 

কিন্তু পূর্ববর্তী সেই সকল প্রস্তাবের তুলনায় ভারতের বর্তমান প্রস্তাবটিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিবিদরা অনেক বেশি ব্যাপক, বাস্তবসম্মত এবং বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করছেন।

 

এর প্রধান কারণ হলো, আগের প্রস্তাবগুলোতে একটি নির্দিষ্ট বা খণ্ডিত বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছিল, যেখানে ভারতের এই আধুনিক প্রস্তাবে অবকাঠামোর সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা, বাণিজ্যিক জাহাজের সম্পূর্ণ অবাধ চলাচল এবং বিশ্ববাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ সচল রাখার মতো বহুমাত্রিক ও জটিল বিষয়গুলো অত্যন্ত সুনিপুণভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ইতিহাস গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ইতিপূর্বে মিশর এবং তুরস্ক যখন এই যুদ্ধে মধ্যস্থতার চেষ্টা করেছিল, তখন তাদের প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য ছিল মূলত কৃষ্ণসাগরে চলাচলকারী জাহাজের ওপর সামরিক হামলা বন্ধ করে কেবল বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।

 

তাদের সেই উদ্যোগে বিশ্ববাজারে সাময়িকভাবে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলেও তা দীর্ঘস্থায়ী কোনো শান্তি বা পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির রূপরেখা তৈরি করতে সক্ষম হয়নি। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যে প্রস্তাবটি দেওয়া হয়েছিল, সেটি মূলত 'জ্বালানি যুদ্ধবিরতি' বা উভয় পক্ষের জ্বালানি অবকাঠামোগুলোর ওপর আক্রমণ বন্ধ করার বিষয়টিকে ঘিরেই আবর্তিত ছিল।

 

এই সকল খণ্ডিত এবং একমুখী উদ্যোগ যুদ্ধের তীব্রতা সাময়িকভাবে কিছুটা কমালেও, একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং পূর্ণাঙ্গ সমাধানের পথ দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে যুদ্ধ তার আপন ধ্বংসাত্মক গতিতেই চলতে থেকেছে এবং মানবিক বিপর্যয় অব্যাহত রয়েছে।

 

ঠিক এই জায়গাটিতেই ভারতের উত্থাপিত তিন-দফা প্রস্তাবটি তার নিজস্ব স্বকীয়তা এবং গভীর কূটনৈতিক দূরদর্শিতার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ রেখেছে। ভারত অত্যন্ত সুকৌশলে পূর্ববর্তী সকল আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ইতিবাচক দিকগুলোকে একত্রিত করার পাশাপাশি কৃষ্ণসাগরে চলাচলকারী বেসামরিক ও বাণিজ্যিক জাহাজের সুরক্ষার ওপর নতুন করে এক বিশেষ মাত্রায় গুরুত্বারোপ করেছে।

 

এর ফলে প্রস্তাবটি কেবল দুই যুদ্ধরত দেশের সাধারণ নাগরিকদের জন্যই নয়, বরং যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাবে বিশ্বব্যাপী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অগণিত মানুষের খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও এক বিশাল আশার আলো হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ফার্স্টপোস্টের গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের এই বহুমুখী, অত্যন্ত মানবিক ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিই তাদের প্রস্তাবটিকে অন্যান্য সকল পশ্চিমা ও আঞ্চলিক উদ্যোগের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা এবং বিবদমান উভয় পক্ষের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

 

দীর্ঘ চার বছর ধরে চলা এই ভয়াবহ, অমানবিক ও প্রাণঘাতী যুদ্ধে হাজার হাজার নিরীহ মানুষের অকাল মৃত্যু, লাখো মানুষের দেশান্তর এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির যে অপূরণীয় ও স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে, তা থেকে সমগ্র বিশ্বকে পুনরুদ্ধার করতে একটি টেকসই যুদ্ধবিরতির কোনো বিকল্প নেই।

 

ভারত ঐতিহাসিকভাবেই তার বৈদেশিক নীতিতে সর্বদা জোটনিরপেক্ষ, স্বাধীন এবং অহিংস অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বজায় রেখে এসেছে। পশ্চিমা বিশ্ব এবং মস্কো-উভয় পক্ষের সাথেই নয়াদিল্লির অত্যন্ত গভীর, ঐতিহাসিক ও ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলগত সম্পর্ক বিদ্যমান রয়েছে।

 

আর এই অনন্য ও বিশ্বাসযোগ্য কূটনৈতিক অবস্থানের কারণেই ভারতের এই মধ্যস্থতার উদ্যোগকে রাশিয়া এবং ইউক্রেন উভয়েই অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবে বলে আন্তর্জাতিক মহল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।

 

যদি নয়াদিল্লির এই তিন দফাভিত্তিক সুচিন্তিত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবটি বিবদমান উভয় পক্ষের সম্মতিতে দ্রুত বাস্তবায়নের মুখ দেখে, তবে তা কেবল পূর্ব ইউরোপের রক্তাক্ত মাটিতেই স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনবে না, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে ভারতের সম্মানজনক অবস্থানকে এক অভাবনীয় উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করবে এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

- ফার্স্টপোস্ট