মালয়েশিয়ায় একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ সফর সমাপ্ত করার পর সোমবার বাংলাদেশের সরকারপ্রধান চীনের লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ান শহরের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই তাঁর প্রথম চীন সফর, আর ঠিক এই কারণেই বেইজিং এই সফরটিকে একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে মূল্যায়ন করছে।
চীনের শীর্ষ নেতৃত্ব আশা করছে, এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নবগঠিত সরকারের সঙ্গে চীনের কৌশলগত যোগাযোগ ও বোঝাপড়া এক অভূতপূর্ব মাত্রায় উন্নীত হবে।
চীনের স্টেট কাউন্সিলের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের বিশেষ আমন্ত্রণে আগামী ২৪ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বেইজিংয়ে তাঁর আনুষ্ঠানিক ও সরকারি সফর সম্পন্ন করবেন।
তবে বেইজিংয়ে মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরুর আগে দালিয়ান শহরে তিনি দুই দিনের অত্যন্ত কর্মব্যস্ত সময় অতিবাহিত করবেন। সেখানে তিনি ‘সামার দাভোস ফোরাম’ বা ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ১৭তম বার্ষিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন।
বৈশ্বিক অর্থনীতির শীর্ষস্থানীয় এই সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
দালিয়ানের এই গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সম্মেলন শেষে তিনি চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে পৌঁছাবেন, যেখানে তাঁর রাষ্ট্রীয় সফরের মূল পর্বের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে। সোমবার বেইজিংয়ে আয়োজিত এক নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই হাই-প্রোফাইল সফর নিয়ে তাঁর সরকারের গভীর প্রত্যাশা ও সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের কথা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বের সম্পর্ক আরও সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।
বিশেষ করে চীনের বহুল আলোচিত ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ বা বিআরআই প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে উচ্চমানের সহযোগিতা আরও ত্বরান্বিত করার বিষয়ে বেইজিং দৃঢ় আশাবাদী।
এর পাশাপাশি বাণিজ্য, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও কৃষি-সবকটি খাতে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করার বৃহৎ পরিকল্পনা রয়েছে চীনের। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আরও জোর দিয়ে বলেছেন, সফরকালে চীনের শীর্ষ রাষ্ট্রীয় নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও একান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
এসব শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নই নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সংকট নিয়েও বিস্তারিত মতবিনিময় হবে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে ও বহুপাক্ষিক ইস্যুগুলোতে দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করার বিষয়টিও এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
এই শীর্ষ সংলাপ ও মতবিনিময় চীন ও বাংলাদেশের মধ্যকার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ গতিপথ ও নতুন রূপরেখা নির্ধারণে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চীন ও বাংলাদেশ যে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত, বিশ্বস্ত ও বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে গুও জিয়াকুন বলেন, দুই দেশ বর্তমানে একে অপরের ব্যাপক কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদার।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কৌশলগত দূরদর্শিতার হাত ধরে বেইজিং ও ঢাকার মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও টেকসই গতিতে সামনের দিকে অগ্রসর হয়েছে।
এই ধারাবাহিকতায় দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক বেশি সুদৃঢ় ও মজবুত অবস্থায় দাঁড়িয়েছে।
পরিশেষে, দুই দেশের এই কৌশলগত অংশীদারত্বকে এক নতুন ও অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ঐকান্তিক আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মুখপাত্রের মতে, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাস্তবমুখী সহযোগিতার ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে অভাবনীয় ও ফলপ্রসূ অর্জন সম্ভব হয়েছে।
এই যুগান্তকারী দ্বিপাক্ষিক উন্নয়নের সুফল কেবল নথিপত্রেই বা রাষ্ট্রীয় চুক্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা উভয় দেশের সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে দৃশ্যমান ও অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই আসন্ন বেইজিং সফরের মাধ্যমে দুই দেশের এই অবিচ্ছেদ্য উন্নয়ন অংশীদারত্ব এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করবে এবং এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতা, শান্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় এক বিরাট অবদান রাখবে বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।