শনিবার, জুলাই ২৫, ২০২৬
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ছররা গুলি ব্যবহারের অভিযোগ, পুলিশের অস্বীকার

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে ছররা গুলি ব্যবহারের অভিযোগ, পুলিশের অস্বীকার
ছবি : Collected

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরে সাম্প্রতিক এক বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ছররা গুলি ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। যদিও পুলিশ এই দাবি সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে, তবে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা প্রতিবেদনে আন্দোলনকারীদের শরীরে ছররা গুলির আঘাতের অকাট্য প্রমাণ মিলেছে।

 

চিকিৎসা সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, ২৮ বছর বয়সী এক বিক্ষোভকারীর ডান কনুই ও পিঠে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, যা স্পষ্টভাবে ছররা গুলির টুকরো হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। শুক্রবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ্যে আনে, যা দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, দেশব্যাপী আলোচিত নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি এই আন্দোলনের ডাক দেয়। গত ২০ জুলাই বিক্ষোভকারীরা যখন তাদের দাবি আদায়ে পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রা শুরু করে, তখন পুলিশ তাদের বাধা প্রদান করে।

 

দলটির অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা ঠেকাতে দিল্লি পুলিশ চরম অমানবিকতা দেখিয়ে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। তবে, আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ছররা গুলি ব্যবহারের অভিযোগটি দিল্লি পুলিশ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং প্রকাশিত খবরগুলোকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে আখ্যা দিয়েছে।

 

দিল্লির প্রখ্যাত সফদরজং হাসপাতালের চিকিৎসা নথি পুলিশের এই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আহত রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত নথিতে স্পষ্টভাবে গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিবরণ লিপিবদ্ধ রয়েছে।

 

সেখানে বলা হয়েছে, রোগীর ক্ষতের চারপাশের চামড়া কালো হয়ে গেছে, আঘাতপ্রাপ্ত স্থানে তীব্র ব্যথা রয়েছে এবং চামড়ার নিচে ধাতব টুকরো আটকে থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গত ২০ জুলাই বিকেল চারটার দিকে ওই বিক্ষোভকারীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল বলে এনডিটিভির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

নিরাপত্তা বাহিনীর অস্ত্র ব্যবহারের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণত সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের অধীনস্থ দাঙ্গা-বিরোধী বিশেষ ইউনিট র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স এই ধরনের ছররা গুলি ও বৈদ্যুতিক লাঠি ব্যবহার করে থাকে। ঘটনার দিন যন্তর মন্তরে দিল্লি পুলিশের পাশাপাশি এই বিশেষ বাহিনীও মোতায়েন ছিল।

 

তবে, ছররা গুলির ব্যবহার নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত নীরবতা পালন করছে। উল্লেখ্য, ২০১০ সালে কাশ্মীরে সহিংসতা দমনের জন্য প্রথম এই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে সমালোচনার মুখে তৎকালীন রাজ্য সরকার তা বন্ধ করলেও, ২০১৬ সালের জুলাই মাসে হিজবুল মুজাহিদিন নেতা বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর সৃষ্ট বিক্ষোভে পুনরায় এর ব্যবহার শুরু হয়।

 

নিয়ম অনুযায়ী, এই অস্ত্র থেকে সর্বোচ্চ ৬০০টি ধাতব বা রাবারের টুকরো ভর্তি কার্তুজ ছোড়া যায়, যা প্রতি সেকেন্ডে প্রায় এক হাজার ফুট বেগে ছড়িয়ে পড়ে। এটি সাধারণত অন্তত ৫০০ ফুট দূর থেকে ছোড়ার নিয়ম রয়েছে এবং এ সময় বন্দুকের নল কোমরের নিচের দিকে তাক করে রাখতে হয়। কিন্তু বিক্ষোভে এই নিয়মের চরম লঙ্ঘন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

 

এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বৃহস্পতিবার গভীর রাতে এক ভিডিওবার্তায় জানিয়েছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে আগামী সপ্তাহে সংসদে একটি নতুন বিল উত্থাপন করা হবে।

 

অন্যদিকে, শুক্রবার সকালে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর উচিত সর্বপ্রথম দেশের ছাত্রদের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং যাদের নির্দেশে এই নিষ্ঠুর হামলা চালানো হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

 

একই সুরে কথা বলেছেন কংগ্রেস সংসদীয় দলের চেয়ারপার্সন সোনিয়া গান্ধী। দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি অভিযোগ করেন, সরকার শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন দমনে চরম কাপুরুষতা ও অকারণ নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে। তরুণ প্রজন্মকে দেশের ভবিষ্যৎ ভাবার বদলে সরকার তাদের রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

২০ জুলাইয়ের পার্লামেন্ট অভিমুখী বিক্ষোভ দমনের ঘটনাকে তিনি একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সেদিন দিল্লি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর ব্যাপকভাবে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে, যার ফলে অনেক সাধারণ মানুষও আহত হন।

 

বিক্ষোভের এই ঘটনায় একাধিক তরুণের ভবিষ্যৎ এখন অন্ধকারের মুখে। সাহিল লোচাব নামের এক বিক্ষোভকারীর ডান চোখে ছররা গুলি বিদ্ধ হয়েছে। দিল্লি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, আহত ৬০ জন বিক্ষোভকারীর মধ্যে নজফগড়ের এই কিশোরও রয়েছে। সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে, এই কিশোরের মুখ, গলা, বুক, ডান কাঁধ ও হাতে একাধিক ছররা গুলির আঘাত রয়েছে।

 

একটি ছররা তার ডান চোখে বিদ্ধ হয়ে কর্নিয়ায় গভীর ছিদ্র তৈরি করেছে এবং আরেকটি ছররা তার ডান ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ডের চারপাশের টিস্যুতে আঘাত হেনেছে। ইতোমধ্যে তার একটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে লেডি হার্ডিঞ্জ ও সফদরজং হাসপাতাল ঘুরে ২১ জুলাই এইমস ট্রমা সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়েছে।

 

একইভাবে, গুরুগ্রামের বাসিন্দা ২৫ বছর বয়সী শেখ মনসুরিও ভয়াবহভাবে আহত হয়েছেন। তার মুখমণ্ডল, গাল, চোখ ও কপালে অন্তত সাতটি ছররা গুলি বিদ্ধ হয়েছে। তাকে লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিকেল কলেজে নেওয়া হয়েছে এবং সেখানে তার প্রাথমিক অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে।

 

- এনডিটিভি