বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৩, ২০২৬
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
দিল্লির ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন

আইআইটি মাদ্রাজের শিক্ষার্থীদের পোস্ট ও ভিডিও মুছে ফেলার নির্দেশ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই, ২০২৬, ০৮:৪০ পিএম

আইআইটি মাদ্রাজের শিক্ষার্থীদের পোস্ট ও ভিডিও মুছে ফেলার নির্দেশ
ছবি : Collected

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে চলমান তীব্র ছাত্র আন্দোলনের ঢেউ এবার আছড়ে পড়েছে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা আইআইটি মাদ্রাজে।

 

শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরানোর দাবিতে এবং দেশজুড়ে আলোচিত প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহাকেলেঙ্কারির প্রতিবাদে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে যে বিশাল গণবিক্ষোভ চলছে, তার প্রতি সংহতি জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট ও ভিডিও প্রকাশ করেছিলেন আইআইটি মাদ্রাজের একদল সচেতন শিক্ষার্থী।

 

তবে শিক্ষার্থীদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অধিকার আদায়ের প্রতিবাদের প্রতি সমর্থন জানানোর কারণে প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর ও রক্ষণশীল অবস্থান গ্রহণ করেছে। আইআইটি মাদ্রাজ কর্তৃপক্ষ অবিলম্বে তাদের শিক্ষার্থীদের সামাজিক মাধ্যম থেকে উক্ত ছাত্র আন্দোলনের সমর্থনমূলক যাবতীয় ভিডিও, ছবি এবং পোস্ট মুছে ফেলার আনুষ্ঠানিক নির্দেশ প্রদান করেছে, যা শিক্ষাঙ্গনে বাকস্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

দিল্লির কেন্দ্রস্থল যন্তর মন্তরে গত বেশ কিছুদিন ধরে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি-এর নেতৃত্বে হাজার হাজার তরুণ এবং সাধারণ শিক্ষার্থী চরম বৈরী আবহাওয়া ও প্রখর রোদ উপেক্ষা করে লাগাতার আন্দোলন ও অনশন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

তাদের প্রধান দাবি হলো শিক্ষাব্যবস্থায় সীমাহীন ব্যর্থতার দায় নিয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ এবং শিক্ষাক্ষেত্রে চলমান কাঠামোগত দুর্নীতির চিরস্থায়ী অবসান। মূলত এই যৌক্তিক দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেই ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল মাধ্যমে এবং রাজপথে সোচ্চার হয়েছেন।

 

তরুণ প্রজন্মের এই অভিনব আন্দোলনে প্রথাগত স্লোগান ও পোস্টারের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম একটি অত্যন্ত শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় আইআইটি মাদ্রাজের কিছু বিবেকবান শিক্ষার্থী জনপ্রিয় মাধ্যম ইনস্টাগ্রামসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমে অনশনরত ও আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের অদম্য সাহসের ভূয়সী প্রশংসা করে এবং তাদের দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে একাধিক ভিডিও বার্তা ও সংহতিমূলক পোস্ট প্রকাশ করেছিলেন।

 

তবে শিক্ষার্থীদের এই স্বাধীন মতপ্রকাশ ও গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চাকে বিন্দুমাত্র ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেনি আইআইটি মাদ্রাজ প্রশাসন। ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির কাছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানটির এক শিক্ষার্থী অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, গত বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন এবং সংশ্লিষ্ট ফ্যাকাল্টি অ্যাডভাইজরের পক্ষ থেকে তাদের ওপর এই বিষয়ে সরাসরি ও অন্যায্য প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করা হয়।

 

তাদের অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন দ্রুততম সময়ের মধ্যে যন্তর মন্তরের আন্দোলনের সঙ্গে সম্পর্কিত সকল ডিজিটাল কনটেন্ট ইন্টারনেট থেকে পুরোপুরি সরিয়ে ফেলা হয়।

 

শিক্ষার্থীদের কাছে পাঠানো প্রশাসনের এক সতর্কবার্তায় অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণেই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে প্রকাশিত সব ধরনের ভিডিও, ছবি ও সংহতিমূলক পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে।

 

প্রশাসনিক শাস্তির ভয়ে অনেক শিক্ষার্থী ইতোমধ্যেই তাদের পোস্টগুলো মুছে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই নজিরবিহীন নির্দেশনার পর থেকে ক্যাম্পাস অভ্যন্তরে এবং দেশজুড়ে শিক্ষামহলে নতুন করে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে।

 

একদিকে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ দ্রুত বিচার আদালত গঠনের আশ্বাস দিচ্ছেন এবং সরকার নানাভাবে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই আইআইটি মাদ্রাজের মতো একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ও স্বনামধন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এমন দমনমূলক আচরণ শিক্ষার্থীদের মৌলিক বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি ও নগ্ন আঘাত বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

 

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেকোনো যৌক্তিক অধিকার চর্চা এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া অন্যায় ও পুলিশি নিপীড়নের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে সমর্থন জানানো একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।

 

কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রশাসনের এমন মাত্রাতিরিক্ত কঠোর নজরদারি এবং অগণতান্ত্রিক সেন্সরশিপ ভারতের বর্তমান ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তাপকে প্রশমিত করার বদলে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

দিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান এই বিশাল ছাত্র আন্দোলন ইতোমধ্যে ভারতের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং সংবাদমাধ্যমেরও ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।

 

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেখা গেছে, দেশজুড়ে মাত্রাতিরিক্ত পুলিশি সহিংসতার শিকার হওয়া মানুষদের পাশে দাঁড়াতে সাধারণ তরুণরা রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন এবং ব্যঙ্গচিত্র বা মিম সংস্কৃতির মতো সম্পূর্ণ অভিনব পন্থায় রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছে নিজেদের দাবি তুলে ধরছেন।

 

ঠিক এমন একটি জাতীয় জাগরণের মুহূর্তে আইআইটি মাদ্রাজের মতো একটি প্রথম সারির বিদ্যাপীঠের এমন নিয়ন্ত্রণমূলক ও অসহিষ্ণু পদক্ষেপ দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে এক নতুন ক্ষোভের সঞ্চার করেছে।

 

শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কর্তৃপক্ষের উচিত তরুণ শিক্ষার্থীদের স্বাধীন চিন্তা, গঠনমূলক সমালোচনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে সর্বদা সম্মান জানানো। তা না করে প্রশাসনিক ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক তাদের কণ্ঠরোধ করার এই হীন অপচেষ্টা চলমান জাতীয় সংকটকে সমাধানের পথে না নিয়ে গিয়ে বরং আরও জটিল ও ঘনীভূত করতে পারে।

 

ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরেই ছাত্র রাজনীতির চর্চা এবং জাতীয় ইস্যুগুলোতে শিক্ষার্থীদের সরব উপস্থিতি একটি ঐতিহ্যবাহী বিষয়। অন্যান্য শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি আইআইটি মাদ্রাজের শিক্ষার্থীরাও যখন জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো যৌক্তিক ইস্যুতে কথা বলতে শুরু করেন, তখন তা সমাজকাঠামোতে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক বার্তা দেয়।

 

কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, প্রশাসন অত্যন্ত সুকৌশলে শিক্ষার্থীদের এই একতা এবং প্রতিবাদী সত্তাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার চেষ্টা করছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের যে একদফা দাবিতে গোটা দেশ আজ উত্তাল, সেই দাবির প্রতি আইআইটি শিক্ষার্থীদের এই ভার্চুয়াল সংহতি সরকারের ওপর বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করতে পারত বলেই হয়তো তড়িঘড়ি করে এমন কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন অনেক বিশ্লেষক।

 

তবে ইতিহাস সাক্ষী দেয়, ভয়ভীতি বা প্রশাসনিক নোটিশ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচারের কণ্ঠকে বেশিদিন দমিয়ে রাখা সম্ভব নয়। যন্তর মন্তরের তীব্র আন্দোলন আজ ডিজিটাল মাধ্যম পেরিয়ে সমগ্র ভারতের ছাত্রসমাজের একটি অভিন্ন আত্মপরিচয়ের অংশে পরিণত হয়েছে।

 

এনডিটিভি