শুক্রবার, জুলাই ২৪, ২০২৬
৯ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রশ্নফাঁস কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে উত্তাল কলকাতা

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ জুলাই, ২০২৬, ০৯:১৬ পিএম

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ
ছবি : Collected

ভারতের চিকিৎসাশাস্ত্রের প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে দেশজুড়ে চলমান তীব্র অসন্তোষ ও ছাত্র আন্দোলনের ঢেউ এবার আছড়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায়। মেধার অবমূল্যায়ন এবং শিক্ষাব্যবস্থায় নজিরবিহীন দুর্নীতির সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে শুক্রবার কলকাতার রাজপথে নেমে আসেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের শত শত বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী।

 

শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ কর্মসূচি একপর্যায়ে চরম সংঘাতময় আকার ধারণ করে, যখন আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে এবং মুহুর্মুহু কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে।

 

নির্ভরযোগ্য স্থানীয় গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, এই নজিরবিহীন পুলিশি পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে সমগ্র কলকাতা শহরে এক ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান জাতীয় মাত্রার সংকটকে আরও গভীরভাবে উন্মোচিত করেছে।

 

শুক্রবার দুপুরের পর থেকেই মূলত কলকাতার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক ধর্মতলা বা এসপ্ল্যানেড এলাকায় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষার্থীরা দলে দলে জড়ো হতে শুরু করেন।

 

শিক্ষার্থীদের এই সম্মিলিত ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচিত রাজনৈতিক দল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র বিপুল সংখ্যক সমর্থকও এই মিছিলে যোগ দেন।

 

প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, শত শত আন্দোলনকারী একজোট হয়ে ধর্মতলা সংলগ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডোরিনা ক্রসিং এলাকাটি সম্পূর্ণভাবে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এর ফলে কলকাতার অন্যতম প্রধান ওই এলাকার যান চলাচল এবং স্বাভাবিক নাগরিক জীবন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে।

 

পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও দাঙ্গা পুলিশের সদস্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তাদের ব্যাপক বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি চরম উত্তেজনাকর রূপ নেয় এবং ক্ষুব্ধ আন্দোলনকারীদের একটি অংশ দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্য করে জুতো, ইটপাটকেল ও পানির বোতল ছুড়ে মারতে শুরু করেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।

 

শিক্ষার্থীদের এমন মারমুখী ও আক্রমণাত্মক আচরণের মুখে পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। আন্দোলনকারীদের মূল সড়ক থেকে সরিয়ে দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে পুলিশ সদস্যরা প্রথমে বিক্ষোভকারীদের সরে যাওয়ার জন্য বারবার সতর্কতামূলক ঘোষণা দিয়ে অনুরোধ করেন।

 

কিন্তু শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায়সঙ্গত দাবিতে অনড় থেকে স্লোগান দিতে থাকলে পুলিশ বাধ্য হয়ে বেধড়ক লাঠিচার্জ শুরু করে। এতেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় এবং বিক্ষোভকারীরা ছত্রভঙ্গ না হওয়ায় একপর্যায়ে তাদের লক্ষ্য করে ব্যাপক হারে কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করা হয়।

 

পুরো ধর্মতলা ও ডোরিনা ক্রসিং এলাকা মুহূর্তের মধ্যেই বিষাক্ত ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে এবং সাধারণ পথচারী ও যাত্রীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের এই অতিমাত্রায় কঠোর পদক্ষেপের কারণে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন অসমর্থিত সূত্রে জানা গেলেও, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।

 

কলকাতার রাজপথে ঘটা এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের নেপথ্য কারণ সম্পর্কে পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমের কাছে তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তুলে ধরেছেন। পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে একটি বড় অংশ ছিল যারা নিজেদের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সক্রিয় সমর্থক বলে জোর দাবি করেছিল।

 

এই রাজনৈতিক সংগঠনটি শুরুতে প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে শহরে একটি সম্পূর্ণ পৃথক প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কথা বিবেচনা করে পুলিশ প্রশাসন তাদের সেই একক সমাবেশের অনুমতি প্রদান করেনি।

 

পুলিশের অনুমতি না পেয়ে সংগঠনটি বাধ্য হয়ে নিজেদের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি সাময়িকভাবে বাতিল ঘোষণা করে। তবে পরবর্তীতে এই সংগঠনের সমর্থকরা অত্যন্ত সুকৌশলে ধর্মতলায় অনুষ্ঠিত বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর চলমান প্রতিবাদ মিছিলের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে যুক্ত হয় এবং সেখান থেকেই মূলত পুলিশকে লক্ষ্য করে বোতল নিক্ষেপের মতো উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করে।

 

তবে পুলিশের এই সাঁড়াশি অভিযান, নির্বিচার লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপের পরও রাজপথে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অদম্য মনোবল পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এত কঠোর ও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ সত্ত্বেও পুলিশ ওই এলাকা থেকে আন্দোলনকারীদের সম্পূর্ণরূপে বিতাড়িত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়।

 

বরং, কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া ও পুলিশের লাঠির নির্মম আঘাত উপেক্ষা করেও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ধর্মতলা চত্বরে তাদের শক্ত অবস্থান ধরে রাখেন এবং পূর্ণ মাত্রায় তাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি চালিয়ে যান।

 

শিক্ষার্থীদের এই অনড় অবস্থান সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, প্রশ্নফাঁসের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও স্পর্শকাতর বিষয়টি দেশের আপামর তরুণ সমাজের মনে কতটা গভীর ক্ষোভ, হতাশা ও বঞ্চনাবোধের জন্ম দিয়েছে। মেধার মূল্যায়ন ও শিক্ষা খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই নিয়মতান্ত্রিক সংগ্রাম কোনোভাবেই থামবে না বলে আন্দোলনকারীরা দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

 

- টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া