বৃহস্পতিবার, জুলাই ২৩, ২০২৬
৮ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতের প্রশ্নফাঁস বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নতুন অস্ত্র ‘আরর্লিং হল্যান্ড’

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ জুলাই, ২০২৬, ০৮:২০ পিএম

ভারতের প্রশ্নফাঁস বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নতুন অস্ত্র ‘আরর্লিং হল্যান্ড’
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের চিকিৎসা ও উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দেশব্যাপী প্রশ্নপত্র ফাঁসের মহাকেলেঙ্কারির প্রতিবাদে এবং চরম ব্যর্থতার দায় নিয়ে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবিতে দেশজুড়ে চলমান ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হয়েছে এক অভাবনীয় ও অভিনব মাত্রা।

 

তরুণ প্রজন্মের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও তীব্র গণআন্দোলনে আধুনিক ইন্টারনেট বা আন্তর্জালের সমসাময়িক প্রবণতাকে এখন একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অত্যন্ত কৌতূহলোদ্দীপক ও বিস্ময়কর বিষয় হলো, ভারতের অভ্যন্তরীণ এই তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিক্ষোভের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতের মানুষ, বিখ্যাত নরওয়েজীয় ফুটবল তারকা আর্লিং হালান্ড।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অগণিত ব্যবহারকারী এবং নাগরিক কৌতুকশিল্পীরা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ব্যঙ্গবিদ্রূপের মাধ্যমে এমন একটি ধারণা অত্যন্ত সুকৌশলে প্রচার করছেন যে, বিশ্বের সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারতের চলমান এই কাঠামোগত শিক্ষাসংকটের ভবিষ্যৎ সমাধান যেন এখন কেবল এই ইউরোপীয় ফুটবলারের একটি পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করছে।

 

প্রথাগত রাজনৈতিক আন্দোলনের বাইরে গিয়ে তরুণদের এই ভিন্নধর্মী প্রতিবাদ আন্তর্জাতিক মহলেরও ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। পঁচিশ বছর বয়সী এই তারকা স্ট্রাইকার, যিনি ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবল এবং আসন্ন ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে বিশ্বজুড়ে ক্রীড়ামোদী দর্শকদের কাছে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন, গত দুই সপ্তাহে ভারতের অন্তর্জালে তরুণদের কাছে এক ব্যঙ্গাত্মক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।

 

তরুণদের কাছে তিনি কৌতুকের ছলে এক পরম আরাধ্য ব্যক্তিত্ব বা ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এই চলমান ব্যঙ্গাত্মক বা মিম সংস্কৃতিতে তাকে ভারতের বর্তমান গভীর শিক্ষাসংকটের এক কল্পিত সমাধানকারী হিসেবে অত্যন্ত শৈল্পিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে।

 

তরুণ প্রজন্মের এই অভিনব ও সৃজনশীল প্রতিবাদের অংশ হিসেবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নাম ব্যবহার করে খোলা একটি সম্পূর্ণ ছদ্ম অ্যাকাউন্ট থেকে একটি অত্যন্ত কৌতুকপূর্ণ ও ইঙ্গিতবাহী বার্তা প্রকাশ করা হয়।

 

ওই অভাবনীয় বার্তায় লেখা হয়েছিল যে, আর্লিং হালান্ড যদি কোনোভাবে এই পোস্টের একটি উত্তর দেন, তবেই কেবল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি বিতর্কিত শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করবেন।

 

রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ নির্বাহীর নাম ব্যবহার করে তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ ও চরম হতাশার এক অভিনব বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা এই বার্তাটি অন্তর্জালে প্রকাশের মুহূর্তের মধ্যেই দাবানলের মতো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

 

উক্ত বার্তাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে সেখানে হাজার হাজার ক্ষুব্ধ অথচ সৃজনশীল ভারতীয় তরুণ তাদের নিজস্ব মতামত ব্যক্ত করতে শুরু করেন। মন্তব্যকারীদের একজন অত্যন্ত আবেগঘন অথচ কৌতুকপূর্ণ ভাষায় এই বিশ্বখ্যাত ফুটবল তারকার কাছে সরাসরি আবেদন জানিয়ে লেখেন যে, তিনি যেন অন্তত একটিবার সাড়া দিয়ে একটি পুরো দেশকে এই গভীর দুর্নীতি ও সংকট থেকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসেন।

 

অপর একজন ব্যবহারকারী দেশের চরম রাজনৈতিক হতাশা ও কঠিন বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরে তীব্র ব্যঙ্গ করে মন্তব্য করেন যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর স্বেচ্ছায় নিজের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার যে অতি ক্ষীণ সম্ভাবনা রয়েছে, তার চেয়ে আর্লিং হালান্ডের মতো ভিনদেশি তারকার ওই বার্তায় উত্তর দেওয়ার সম্ভাবনা অন্তত শতগুণ বেশি বাস্তবসম্মত।

 

তরুণ প্রজন্মের এই ডিজিটাল বা আন্তর্জালভিত্তিক বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিবাদে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি যোগ দিয়েছেন ভারতের জনপ্রিয় কৌতুকশিল্পী অনির্বাণ দাশগুপ্তও। তিনি ওই পোস্টে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক একটি মন্তব্য করে লেখেন, আর্লিং যেন এই সুযোগটিকে হেড করে একটি দারুণ গোল করেন, আর সেটিই নিঃসন্দেহে হবে এই মৌসুমের সবচেয়ে সেরা ও স্মরণীয় গোল।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই অভিনব ও হাস্যরসাত্মক প্রবণতা কেবল ডিজিটাল জগতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি অত্যন্ত কার্যকরভাবে রাজপথের বাস্তব আন্দোলনেও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে।

 

ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানীখ্যাত মুম্বাইয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে আয়োজিত এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা আর্লিং হালান্ডের মাঠে গোল উদযাপনের বিখ্যাত ধ্যানমগ্ন ভঙ্গিটি দলবদ্ধভাবে অনুকরণ করে তাদের অভিনব প্রতিবাদ সাব্যস্ত করেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক নেতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসন যখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের মেধা সুরক্ষা ও যৌক্তিক দাবিগুলো পূরণে চরমভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে, ঠিক তখনই নতুন প্রজন্মের এই তরুণরা তাদের পুঞ্জীভূত হতাশা, তীব্র ক্ষোভ এবং ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে প্রকাশ করতে ইন্টারনেট সংস্কৃতি ও ব্যঙ্গচিত্রকে নিজেদের প্রধান ও অহিংস হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন।

 

সমকালীন ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে চলমান এই বিশাল গণজাগরণকে প্রথম বৃহৎ নতুন প্রজন্মের বা প্রজন্ম-জেড আন্দোলন হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এই আন্দোলনটি রাজপথের প্রথাগত স্লোগান, মিছিল ও রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি অন্তর্জালে অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া বিষয়বস্তু বা ভাইরাল কনটেন্টের মাধ্যমেও সমান ও অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের যেকোনো গণআন্দোলনের জন্য এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

 

- টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া