সরকারের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের সঙ্গে টানা তৃতীয় দফার দীর্ঘ ও রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর সংগঠনটির পক্ষ থেকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের এই মূল দাবির প্রশ্নে তারা বিন্দুমাত্র আপস করতে রাজি নয়।
তাদের এই অনড় ও আপসহীন অবস্থানের ফলে গোটা দেশজুড়ে নতুন করে এক বড় ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শুক্রবার, ২৪ জুলাই ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ভিঠলভাই প্যাটেল হাউসে কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ককরোচ জনতা পার্টির এই অতি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ তৃতীয় দফার বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়া এই তীব্র সংকট নিরসনে সরকারের পক্ষ থেকে এই বিশেষ বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং।
অন্যদিকে, রাজপথে আন্দোলনরত লাখো ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীর পক্ষে আলোচনার টেবিলে উপস্থিত ছিলেন সিজেপির জাতীয় মুখপাত্র সৌরভ দাসসহ দুই সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই বৈঠকে চলমান অচলাবস্থা কাটানোর বিভিন্ন উপায় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হলেও, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র মতানৈক্য বজায় থাকে।
বৈঠক সমাপ্ত হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সিজেপির নেতৃবৃন্দ জানান যে, সরকার তাদের বেশ কিছু দাবি মেনে নিতে নীতিগতভাবে সম্মতি জ্ঞাপন করেছে। বিশেষ করে, চলমান এই ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপে যে সকল নিরীহ শিক্ষার্থী মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে, দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনরত হাজার হাজার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে পুলিশ যেসব প্রথমিক তথ্য বিবরণী বা এফআইআর দায়ের করেছিল, সেগুলো অবিলম্বে ও সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ব্যাপারেও সরকারের প্রতিনিধিরা সবুজ সংকেত দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এতদসত্ত্বেও, শিক্ষা ব্যবস্থার শীর্ষ অভিভাবক হিসেবে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ব্যর্থতার চরম দায় স্বীকার করে তার পদত্যাগের যে অবিচল দাবি শিক্ষার্থীরা তুলেছেন, সে বিষয়ে সরকার কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস না দেওয়ায় আন্দোলনকারীরা চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে সিজেপির জাতীয় মুখপাত্র সৌরভ দাস অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে তাদের দাবিগুলো দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেন যে, আন্দোলনে নিহত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর পরিবারকে ক্ষতিপূরণ বাবদ এক কোটি রুপি করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব ধরনের মিথ্যে ও হয়রানিমূলক আইনি মামলা নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার করতে হবে।
তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন যে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয়টি তাদের সংগঠনের জন্য সম্পূর্ণ আপসহীন একটি বিষয় এবং কোনো প্রলোভন বা চাপেই এই দাবির বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। এই বিষয়ে সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা আনুষ্ঠানিকভাবে দেশবাসীকে জানানোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারকে শনিবার বেলা ২টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
সৌরভ দাস আরও উল্লেখ করেন যে, সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীদের বিশেষ অনুরোধের প্রেক্ষিতে এবং আলোচনার পরিবেশকে ইতিবাচক ও সংঘাতমুক্ত রাখার স্বার্থে শনিবার নির্ধারিত সময়সীমা পর্যন্ত দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে চলমান তাদের লাগাতার প্রতিবাদ কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত রাখতে সিজেপি সম্মত হয়েছে।
তবে তিনি অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বেঁধে দেওয়া এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি সরকার তাদের প্রধান দাবি পূরণে ব্যর্থ হয় বা কোনো ধরনের টালবাহানার আশ্রয় নেয়, তবে এই আন্দোলন এক নতুন ও ভয়াবহ মাত্রায় সমগ্র দেশজুড়ে শুরু হবে।
সিজেপির অপর শীর্ষ মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কাও গণমাধ্যমের সামনে একই ধরনের জোরালো হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, সরকার যদি সাধারণ শিক্ষার্থীদের এই যৌক্তিক ও গণতান্ত্রিক দাবি প্রত্যাখ্যান করার হঠকারিতা দেখায়, তবে দেশজুড়ে আরও বৃহত্তর পরিসরে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তোলা হবে, যার সম্পূর্ণ দায়ভার সরকারকে একাই বহন করতে হবে।
অন্যদিকে, এই শ্বাসরুদ্ধকর বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার বিষয়ে গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, চলমান এই গভীর সংকট নিরসনে এবং একটি সর্বসম্মত ও টেকসই সমাধানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে শনিবার সিজেপির শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সরকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে এবং দেশজুড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনতে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানের পথ খুঁজছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের যে ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে, তা কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলন ইতোমধ্যে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
দেশের ভঙ্গুর পরীক্ষা ব্যবস্থায় আমূল সংস্কার আনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মের এই তীব্র আন্দোলন বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু-এর তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, এই সংকটের দ্রুত ও সম্মানজনক সমাধান না হলে তা আগামী দিনে মোদি সরকারের ভাবমূর্তিতে এক দীর্ঘস্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।