বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৬
২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চীনের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার আগে সবকিছু হারিয়েছিলেন শি জিনপিং

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০১:৫৮ পিএম

চীনের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার আগে সবকিছু হারিয়েছিলেন শি জিনপিং
ছবি : Collected

বর্তমান বিশ্বে অন্যতম প্রভাবশালী এবং পরাক্রমশালী রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে সুপরিচিত চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং। গত প্রায় চৌদ্দ বছর ধরে তিনি চীনের শাসনক্ষমতার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন।

 

তার এই দীর্ঘ শাসনকালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি যেমন নিজেদের নতুন করে গুছিয়ে নিয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বেইজিংয়ের অবস্থান এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছেছে। তার সুদৃঢ় নেতৃত্ব, অভ্যন্তরীণ সংস্কার এবং দূরদর্শী বৈদেশিক নীতির কারণে চীন আজ অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।

 

তবে তিয়াত্তর বছর বয়সী এই বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদের জীবনের গল্প কেবলই ক্ষমতার মসৃণ পথে হাঁটার গল্প নয়। তার জীবনের পাতা উল্টালে দেখা যায় এক চরম নাটকীয়তা, যেখানে রয়েছে বড় ধরনের উত্থান এবং পতনের এক দীর্ঘ আখ্যান।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিনি ছিলেন সেই বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত 'রাজপুত্র', ভাগ্যচক্রে যাকে তার জীবনের একটি পর্যায়ে এসে সবকিছু হারাতে হয়েছিল। আজকের এই লৌহকঠিন নেতার শৈশব ও কৈশোরের ইতিহাস ঘাঁটলে এক ভিন্ন শি জিনপিংয়ের দেখা মেলে।

 

শি জিনপিংয়ের জীবনের শুরুটা হয়েছিল এক অত্যন্ত অভিজাত এবং বিশেষ সুবিধাজনক পরিবেশে। ১৯৫৩ সালে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা শি ঝংজুন ছিলেন চীনের একজন প্রখ্যাত কমিউনিস্ট বিপ্লবী নেতা।

 

আধুনিক গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠায় তার পিতার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক। তৎকালীন শীর্ষ নেতৃত্বের অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা হিসেবে শি ঝংজুন কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চ পর্যায়ে নিজের স্থান করে নিয়েছিলেন।

 

নিষ্ঠা, মেধা ও যোগ্যতার বলে তিনি পরবর্তীতে দলের একজন ঊর্ধ্বতন নেতা এবং রাষ্ট্রের উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সেই সুবাদে শি জিনপিংয়ের শৈশব কেটেছে এক চরম আভিজাত্য এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার নিশ্ছিদ্র চাদরে।

 

পিতা শি ঝংজুনের ষষ্ঠ সন্তান হিসেবে শি জিনপিংয়ের বেড়ে ওঠা ছিল আর দশজন সাধারণ চীনা শিশুর চেয়ে একেবারেই আলাদা। শৈশবে তিনি চীনের নামকরা এবং অভিজাত বিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা করার বিরল সুযোগ পেয়েছিলেন, যেখানে কেবল রাষ্ট্রের শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সন্তানরাই অধ্যয়ন করতে পারত।

 

বিলাসবহুল জীবনযাপন, উন্নত শিক্ষা এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তরের সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার মাধ্যমে তার প্রারম্ভিক জীবন এক রূপকথার গল্পের মতোই নির্বিঘ্নে এগিয়ে যাচ্ছিল। সাধারণ চীনা নাগরিকদের জন্য যা ছিল সম্পূর্ণ কল্পনাতীত, তরুণ শি জিনপিংয়ের জন্য তা ছিল দৈনন্দিন জীবনের এক অত্যন্ত স্বাভাবিক অংশ।

 

কিন্তু এই সুখ ও সমৃদ্ধির স্থায়িত্ব খুব বেশিদিন ছিল না। চীনের রাজনৈতিক পালাবদল এবং ক্ষমতার অন্তর্দ্বন্দ্ব অচিরেই তার পরিবারের ভাগ্যকে এক গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। ১৯৬০-এর দশকের প্রথম দিকে চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল আকার ধারণ করতে শুরু করে।

 

শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং সন্দেহ চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। ঠিক সেই সময়ে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও রোষানলের শিকার হন শি জিনপিংয়ের পিতা শি ঝংজুন। রাষ্ট্রের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং দলের একজন একনিষ্ঠ সেবক হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অভিযোগ আনা হয়।

 

তাকে একটি 'দল-বিরোধী' চক্রের অন্যতম সদস্য হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। এই একটি অভিযোগই তাদের পরিবারের সাজানো বাগানকে মুহূর্তের মধ্যে তছনছ করে দেয়। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন শি জিনপিংয়ের জীবনে এক অপ্রত্যাশিত এবং ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনে।

 

যে কমিউনিস্ট পার্টির জন্য তার পিতা নিজের পুরো জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই পার্টিই তাকে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে অভিযুক্ত করে। দল থেকে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে বহিষ্কার করা হয় এবং তার সমস্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও পদমর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়।

 

শুধু তাই নয়, শাস্তিস্বরূপ তাকে রাজধানী বেইজিংয়ের আরামদায়ক জীবন থেকে বিতাড়িত করে গ্রামাঞ্চলের একটি কারখানায় সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করার জন্য নির্বাসনে পাঠানো হয়। পিতার এই আকস্মিক পতন তরুণ শি জিনপিংয়ের জীবনে এক বিশাল মানসিক ও সামাজিক শূন্যতার সৃষ্টি করে।

 

পিতার পতনের পর শি জিনপিংয়ের জীবন এক কঠিন সংগ্রামের আবর্তে পতিত হয়। রাতারাতি এক অভিজাত রাজপুত্র থেকে তিনি সমাজের একজন অবাঞ্ছিত এবং প্রান্তিক মানুষে পরিণত হন। এরপর চীনে যখন 'সাংস্কৃতিক বিপ্লব' শুরু হয়, তখন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

 

তৎকালীন রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ হিসেবে লক্ষ লক্ষ শহুরে তরুণকে জোরপূর্বক গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কৃষি কাজ করার জন্য। এই নির্মম নীতির হাত থেকে রেহাই পাননি কিশোর শি জিনপিংও। তাকে শানজি প্রদেশের এক দুর্গম পাহাড়ি গ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

 

সেখানে তাকে পাহাড়ি গুহায় বসবাস করতে হয়েছিল এবং দিনের পর দিন কৃষকদের সাথে কঠোর কায়িক পরিশ্রম করতে হয়েছিল। ধুলোমাখা সেই দিনগুলোতে তিনি নিজের চোখে দেখেছেন দারিদ্র্য, ক্ষুধা এবং সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার নিরন্তর লড়াই।

 

তবে এই অভাবনীয় পতন এবং অমানুষিক কষ্ট তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে পারেনি। বরং সবকিছু হারানোর এই নির্মম অভিজ্ঞতাই তাকে আরও দৃঢ়, সহনশীল এবং বাস্তববাদী করে তুলেছিল।

 

তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর একমাত্র উপায় হলো রাজনীতি থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়, বরং সেই রাজনৈতিক ব্যবস্থারই অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা। তার বাবার অতীত রেকর্ডের কারণে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদানের জন্য তার প্রাথমিক আবেদনগুলো বারবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল।

 

কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। ক্রমাগত চেষ্টার পর অবশেষে তিনি পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। অদম্য ইচ্ছা, ধৈর্য এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞার মাধ্যমে তিনি নিজেকে তৃণমূল পর্যায় থেকে পুনরায় সংগঠিত করতে শুরু করেন।

 

গ্রামের সাধারণ একজন দলীয় কর্মী থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে নিজের মেধা ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। তার এই তৃণমূলের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তাকে সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং চীনের বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে এক গভীর ও বাস্তবমুখী জ্ঞান দান করে।

 

আজকের শি জিনপিংয়ের যে লৌহকঠিন মানসিকতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সুনির্দিষ্ট দর্শন বিশ্ববাসী দেখতে পায়, তার বীজ মূলত রোপিত হয়েছিল তার সেই হারানো শৈশব এবং সংগ্রামের দিনগুলোতে। সবকিছু হারিয়েও পুনরায় সবকিছু জয় করার এই যে অবিশ্বাস্য যাত্রা, তা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এক বিরল দৃষ্টান্ত।

 

তার জীবনের এই উত্থান-পতন কেবল একজন ব্যক্তির টিকে থাকার গল্প নয়, বরং এটি সমসাময়িক চীনের রাজনৈতিক বিবর্তনেরও এক জীবন্ত দলিল। একসময়ের সমাজ থেকে বিতাড়িত পিতার সন্তান আজ সেই একই দলের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে সমগ্র চীনের ভাগ্য নির্ধারণ করছেন। এই ইতিহাস প্রমাণ করে যে, চরম বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়েও কঠোর অধ্যবসায়, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং অটল লক্ষ্য কীভাবে একজন মানুষকে ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।

 

- বিবিসি