বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ৮, ২০২৬
২২ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দিল্লিতে পাঁচতলা ভবন ধস, বহু মানুষের হতাহতের আশঙ্কা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৭ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:০৪ পিএম

দিল্লিতে পাঁচতলা ভবন ধস, বহু মানুষের হতাহতের আশঙ্কা
ছবি : Collected

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত অত্যন্ত জনবহুল ও ব্যস্ততম সীমাপুরী এলাকায় একটি বিশাল পাঁচতলা ভবন আকস্মিকভাবে ধসে পড়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। বুধবার দুপুরের পর হঠাৎ করেই বিকট শব্দে এই বহুতল ভবনটি সম্পূর্ণভাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে।

 

অপ্রত্যাশিত এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর ওই ভবনের কংক্রিটের বিশাল ধ্বংসস্তূপের নিচে বেশ কয়েকজন নিরীহ বাসিন্দা ও পথচারীর আটকে পড়ার জোরালো আশঙ্কা করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের কাছে এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

 

ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই দুর্ঘটনার বিস্তারিত ও প্রাথমিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুর্ঘটনার পর থেকে ওই সমগ্র এলাকায় এক চরম আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

 

উদ্ধারকর্মীরা আটকে পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধারের আশায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবিরাম কাজ করে যাচ্ছেন। দিল্লি অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে যে, বুধবার স্থানীয় সময় ঠিক দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে তাদের জরুরি হেল্পলাইনে এই ভবন ধসের প্রথম খবরটি পৌঁছায়।

 

খবর পাওয়ার পরপরই কালক্ষেপণ না করে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে দুর্ঘটনাস্থলে অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর একাধিক বিশেষায়িত উদ্ধারকারী গাড়ি ও বিপুল সংখ্যক প্রশিক্ষিত কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। একই সাথে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বাহিনীর সদস্যরাও ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন।

 

তারা অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ও ঘ্রাণশক্তি সম্পন্ন বিশেষ কুকুরের সাহায্যে ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবনের স্পন্দন খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে এলাকার রাস্তাঘাট সরু হওয়ার কারণে এবং উৎসুক জনতার ভিড়ের ফলে উদ্ধারকারী দলগুলোর বড় ভারী যন্ত্রপাতি ঘটনাস্থলে নিয়ে যেতে প্রাথমিক পর্যায়ে বেশ বেগ পেতে হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

 

দুর্ঘটনাস্থল থেকে ধারণ করা বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও ফুটেজে এক অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও চাঞ্চল্যকর দৃশ্য উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ধসে পড়া পাঁচতলা ভবনটি এখন পরিণত হয়েছে ইট, সুরকি, রড আর কংক্রিটের এক বিশাল পাহাড়ে।

 

সেই ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপের চারপাশ ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন শত শত উদ্বিগ্ন মানুষ। এদের মধ্যে অনেকেই নিখোঁজদের স্বজন, যাদের চোখেমুখে কেবলই প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকুল প্রতীক্ষা। সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য হলো, উদ্ধারকারী বাহিনীর পাশাপাশি স্থানীয় সাধারণ মানুষও উদ্ধারকাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাত লাগিয়েছেন।

 

কোনো প্রকার ভারী যন্ত্রপাতির অপেক্ষা না করে, কেবল নিজেদের খালি হাতেই তারা কংক্রিটের বড় বড় স্ল্যাব ও পাথর সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, যদি নিচ থেকে কোনো আহত মানুষকে দ্রুত বের করে আনা যায়। মানুষের প্রতি মানুষের এই অকৃত্রিম সহানুভূতি ও সহমর্মিতা এই চরম বিপদের মুহূর্তে এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

 

এদিকে, দুর্ঘটনার পর সীমাপুরী ও এর আশপাশের এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। উদ্ধার তৎপরতা নির্বিঘ্ন করতে এবং আহতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছানোর লক্ষ্যে দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ অত্যন্ত তৎপর ভূমিকা পালন করছে।

 

তারা জরুরি ভিত্তিতে ওই এলাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা পুনর্গঠন করেছে এবং সাধারণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করেছে। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক জরুরি পোস্টে দিল্লি ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সীমাপুরী এলাকায় একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ার কারণে সেখানে বিভিন্ন উদ্ধারকারী দল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও জটিল উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে।

 

এর প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে সীমাপুরী গোল চত্বর, ডিএলএফ ভোপুরা এবং এর আশপাশের বিভিন্ন প্রধান ও সংযোগ সড়কে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে।

 

এই পরিস্থিতিতে জনদুর্ভোগ এড়াতে এবং সবচেয়ে জরুরি ভিত্তিতে মানুষের জীবন বাঁচাতে দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ সাধারণ নাগরিকদের ওই নির্দিষ্ট এলাকাটি সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলার বিনীত আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি, রাস্তায় থাকা অন্যান্য চালকদের প্রতি তারা কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন যেন তারা নিজেদের লেন সম্পূর্ণ ফাঁকা করে রাখেন।

 

এর মূল উদ্দেশ্য হলো, মুমূর্ষু রোগীদের বহনকারী জরুরি চিকিৎসাসেবা যান বা অ্যাম্বুলেন্স এবং অন্যান্য উদ্ধারকারী যানবাহনগুলো যেন কোনো প্রকার বিলম্ব ছাড়াই দ্রুতগতিতে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারে এবং আহতদের নিয়ে হাসপাতালে ফিরতে পারে।

 

প্রতিটি সেকেন্ড এখন অত্যন্ত মূল্যবান, তাই নাগরিকদের সচেতনতা ও সহযোগিতাই পারে বড় ধরনের প্রাণহানি ঠেকাতে। দিল্লির বুকে এ ধরনের ভবন ধসের ঘটনা এটিই প্রথম নয়, বরং এটি যেন এক ধারাবাহিক মৃত্যুর ফাঁদে পরিণত হয়েছে। সীমাপুরীর এই দুর্ঘটনার ঠিক এক মাস আগে, দিল্লির সত্য নিকেতন এলাকায় অনুরূপ একটি ভয়াবহ ভবন ধসের ঘটনা ঘটেছিল।

 

সেখানে একটি পুরোনো ও সংস্কারাধীন ছাত্রাবাস বা হোস্টেল ধসে পড়ে ঘটনাস্থলেই অন্তত সাতজন নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল এবং আরও বেশ কয়েকজন গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন। সেই শোকাবহ ঘটনার রেশ ও ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি।

 

সত্য নিকেতনের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ঠিক এক মাসের মাথায় সীমাপুরী এলাকায় পুনরায় এমন একটি পাঁচতলা ভবন ধসে পড়ার ঘটনা দিল্লির নগর পরিকল্পনা, ভবন নির্মাণ বিধিমালা এবং প্রশাসনের নজরদারির বিষয়গুলোকে আবারও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।

 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অত্যধিক জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দুর্বল নির্মাণ সামগ্রীর ব্যবহার এবং অনেক ক্ষেত্রে অবৈধভাবে ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের কারণেই দিল্লিতে বারবার এমন বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

 

ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাবিধি বা বিল্ডিং কোড যথাযথভাবে মেনে চলা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চরম গাফিলতি ও উদাসীনতা রয়েছে বলে দীর্ঘদিন ধরেই নগর বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করে আসছেন।

 

সত্য নিকেতন এবং সীমাপুরীর মতো জনবহুল এলাকাগুলোতে বহু পুরোনো ভবন রয়েছে যেগুলোর ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। সামান্য ভূকম্পন বা অতিরিক্ত ভার বহনের ফলেই এগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে থাকে।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক সরকারি কর্মকর্তা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানিয়েছেন, "বর্তমানে আমাদের সর্বোচ্চ এবং একমাত্র অগ্রাধিকার হলো ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের যেকোনো মূল্যে জীবিত উদ্ধার করা।

 

ভবন ধসের এই স্থানটিতে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ব্যাপক তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান চলছে। আমরা প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি।" দুর্ঘটনা কবলিত এলাকার নিকটবর্তী হাসপাতালগুলোকে ইতোমধ্যেই সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।

 

চিকিৎসকদের বিশেষ দল প্রস্তুত রয়েছে যাতে আহতদের হাসপাতালে আনার সাথে সাথেই তাদের নিবিড় চিকিৎসা প্রদান করা যায়। এই ধরণের আকস্মিক বিপর্যয় ওই এলাকার সাধারণ বাসিন্দাদের মনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতের সৃষ্টি করেছে।

 

যারা নিজেদের চোখের সামনে একটি বিশাল ভবনকে ধুলোয় মিশে যেতে দেখেছেন, তাদের অনেকের মাঝেই চরম আতঙ্ক ও ট্রমা কাজ করছে। বিশেষ করে ওই ভবনে বসবাসকারী পরিবারগুলোর স্বজনদের আর্তনাদে এলাকার আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

 

কেউ খুঁজছেন তার সন্তানকে, কেউবা বাবা-মাকে। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ভেসে আসা সামান্যতম শব্দ বা আর্তনাদও উদ্ধারকর্মীদের নতুন করে আশার আলো দেখাচ্ছে, আবার পরক্ষণেই নিস্তব্ধতা তাদের উৎকণ্ঠা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

 

অন্ধকারের ভেতর আটকে থাকা মানুষগুলোর প্রতি মুহূর্ত কাটছে মৃত্যুভয়ে, অক্সিজেন স্বল্পতা ও তীব্র ব্যথার মাঝে। এই মানসিক ও শারীরিক লড়াইয়ের প্রতিটি সেকেন্ড যেন এক একটি যুগের সমান।

 

সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে তাই কেবল ভৌত উদ্ধারকাজেই নয়, বরং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ও পুনর্বাসনেও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। একটি আধুনিক ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকদের বাসস্থানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান মৌলিক দায়িত্ব।

 

পরিশেষে বলা যায়, সীমাপুরীর এই পাঁচতলা ভবন ধসের ঘটনাটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি একটি অপরিকল্পিত ও অনিরাপদ নগর ব্যবস্থার এক চরম অশনিসংকেত। উদ্ধারকাজ শেষ হওয়ার পর হয়তো এই দুর্ঘটনার প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা এবং এর পেছনের সুনির্দিষ্ট কারণগুলো সবার সামনে উঠে আসবে।

 

কিন্তু এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আটকে পড়া মানুষগুলোকে নিরাপদে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। সেই সাথে, ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানি এড়াতে প্রশাসনকে কেবল শোক প্রকাশ বা উদ্ধারকাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; বরং অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর বিরুদ্ধে একটি কঠোর, দীর্ঘমেয়াদী এবং আপসহীন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তবেই হয়তো এমন মৃত্যুফাঁদ থেকে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

 

- এনডিটিভি