গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের এই আন্দোলনকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার লক্ষ্যে নয়াদিল্লির পুলিশ প্রশাসন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। পূর্বনির্ধারিত এই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে সামনে রেখে রাজধানী এবং এর আশপাশের এলাকাগুলোতে রাতভর সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে পুলিশ ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ও সমালোচনামুখর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যক্তিত্ব এবং ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিসহ অন্তত এক হাজার প্রতিবাদী জনতাকে আটক করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই নজিরবিহীন ধরপাকড়কে গভীর উদ্বেগের দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে। ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি বেশ কিছুদিন ধরেই ভারতের নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছিল।
এই ধারাবাহিকতায় শনিবার সকাল দশটার দিকে নয়াদিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর এলাকায় এক বিশাল গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল দলটি। তাদের প্রধান দাবি ছিল বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অবিলম্বে পদত্যাগ, কারণ দলটির অভিযোগ-তার নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করতে ব্যর্থ হচ্ছে।
এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক কর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের যোগ দেওয়ার কথা ছিল। বিশেষ করে তরুণ সমাজের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠির এই কর্মসূচিতে সশরীরে উপস্থিত থাকার কথা আগেই ঘোষণা করা হয়েছিল, যা এই আন্দোলনকে এক ভিন্ন মাত্রা প্রদান করেছিল।
তবে শনিবারের সূর্য ওঠার আগেই এই আন্দোলন দমনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। শনিবার ভোরে রাজধানী দিল্লির একেবারে সংলগ্ন শহর গুরুগ্রাম থেকে পুলিশ ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিকে আটক করে। ধ্রুব রাঠি তার বিশ্লেষণধর্মী ভিডিও এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির গঠনমূলক ও তীক্ষ্ণ সমালোচনার জন্য ভারতজুড়ে ব্যাপক পরিচিত।
সরকারের নানা পদক্ষেপের পেছনের সত্য তুলে ধরার কারণে তিনি অনেক আগেই ক্ষমতাসীনদের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলেন। তার মতো একজন প্রভাবশালী নাগরিককে এভাবে ভোরের অন্ধকারে আটক করার ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ধ্রুব রাঠিকে আটকের মাধ্যমে প্রশাসন মূলত তরুণ সমাজ এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের কাছে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছে, যাতে কেউ সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস না দেখায়।
সিজেপির এই বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থলে, বিশেষ করে যন্তর মন্তর এবং এর আশপাশের এলাকাগুলোতে এক নজিরবিহীন ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে যন্তর মন্তর এলাকায় সাত স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা মোতায়েন করা হয়েছে।
এই এলাকাটিকে কার্যত একটি দুর্গে পরিণত করা হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। শনিবার সকালে যখন কিছু উৎসাহী এবং বিক্ষুব্ধ জনতা কনট প্লেস এলাকা থেকে নিরাপত্তা ব্যারিকেড ভেঙে যন্তর মন্তরের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে, তখন পুলিশ তাদের ওপর চড়াও হয়।
ব্যারিকেড ভাঙার অভিযোগে সেখান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে অন্তত দেড়শ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করে পুলিশ ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। দিল্লি পুলিশের এই ধরপাকড় কেবল শনিবার সকালেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং শুক্রবার রাত থেকেই রাজধানী ও এর পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক পুলিশি অভিযান শুরু হয়।
বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাতভর চলা এই সাঁড়াশি অভিযানে পুলিশ প্রায় এক হাজার মানুষকে আটক করেছে। আটকদের মধ্যে সিজেপির মাঠপর্যায়ের কর্মী, সাধারণ সমর্থক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।
এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে একসঙ্গে আটক করার ঘটনা সাম্প্রতিক অতীতে দিল্লিতে খুব কমই দেখা গেছে। প্রশাসন এই আটক অভিযানকে ‘প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ হিসেবে আখ্যায়িত করলেও, মানবাধিকার কর্মীরা একে গণতান্ত্রিক মতপ্রকাশের ওপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করছেন।
এই বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচি মোকাবিলার জন্য দিল্লি পুলিশ আগে থেকেই ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিল। রাজধানীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার কথা বলে পঁচিশ হাজারেরও বেশি পুলিশ এবং আধা-সামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
এর পাশাপাশি পুরো এলাকার ওপর নজরদারি চালানোর জন্য তিন শতাধিক অত্যাধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা এবং ড্রোন ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বিক্ষোভকারীদের আটক করে রাখার জন্য নয়াদিল্লির বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত বারোটি অস্থায়ী বন্দিশিবির বা ডিটেনশন ক্যাম্প প্রস্তুত করে রেখেছে প্রশাসন।
একটি গণতান্ত্রিক দেশে শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য এতগুলো বন্দিশিবির প্রস্তুত রাখার ঘটনা নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ককরোচ জনতা পার্টির পক্ষ থেকে এই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ কর্মসূচির জন্য অনেক আগেই দিল্লি পুলিশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমতি চাওয়া হয়েছিল। তবে পুলিশ প্রশাসন সেই আবেদন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। পুলিশের পক্ষ থেকে অনুমতি না দেওয়ার পেছনে বেশ কিছু যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রশাসনিক নিয়মকানুন লঙ্ঘন, অতীতে এ ধরনের কর্মসূচিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইতিহাস, বিশাল জনসমাগমের কারণে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা এবং রাজধানীতে যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে পুলিশ এই জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।
পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের জমায়েত প্রতিহত করতে রাজধানী নয়াদিল্লিতে ‘ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা’ বা বিএনএসএস-এর ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে।
এই ধারার অধীনে রাজধানীতে পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির একসঙ্গে জমায়েত হওয়া, সভা-সমাবেশ করা এবং যেকোনো ধরনের মিছিল বা বিক্ষোভ প্রদর্শন সম্পূর্ণ বেআইনি ঘোষণা করা হয়েছে। এই আইনি হাতিয়ার ব্যবহার করে পুলিশ যেকোনো স্থানে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের তল্লাশি এবং বিনা পরোয়ানায় আটক করার ক্ষমতা প্রয়োগ করছে।
পুরো দিল্লি যেন বর্তমানে এক অঘোষিত অবরুদ্ধ নগরীতে পরিণত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের চলাফেরার ওপরও তীক্ষ্ণ নজরদারি চালানো হচ্ছে। নয়াদিল্লির এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতি এবং সরকারের কঠোর পুলিশি পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন সিজেপির শীর্ষ সংগঠক এবং কেন্দ্রীয় নেতা অভিজিৎ দীপকে।
শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ এবং আবেগময় বার্তায় তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং তার নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকারকে সরাসরি নিশানা করেন। অভিজিৎ দীপকে তার বিবৃতিতে বলেন যে, তাদের গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগেই নরেন্দ্র মোদি কার্যত নিজের মানসিক পরাজয় মেনে নিয়েছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারী এবং সাধারণ নাগরিকদের ওপর এই ব্যাপক দমন-পীড়ন এবং দেশের রাজধানী দিল্লিকে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করে কার্যত অবরুদ্ধ করে ফেলা কোনো শক্তিশালী বা আত্মবিশ্বাসী সরকারের কাজ হতে পারে না।
অভিজিৎ দীপকে তার বিবৃতিতে আরও জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, এই ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণ কোনো রাষ্ট্রীয় শক্তির পরিচয় বহন করে না, বরং এটি এমন একজন নেতার লক্ষণ যিনি তার নিজের দেশের সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে ভয় পান।
তার এই বক্তব্য বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরগুলোতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং সরকারের গণতান্ত্রিক সদিচ্ছা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সব মিলিয়ে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক চর্চার ইতিহাসে একটি গভীর দাগ কেটে যাচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে এই আন্দোলন কোন দিকে মোড় নেয় এবং সরকার কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেয়, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে পুরো দেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।