শনিবার, অক্টোবর ১৭, ২০২৬
১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘তিরঙ্গা যাত্রা’ শুরুর আগেই পুলিশের হাতে আটক সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:০৩ পিএম

‘তিরঙ্গা যাত্রা’ শুরুর আগেই পুলিশের হাতে আটক সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে
ছবি : Collected

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে রাজনৈতিক অধিকার, নাগরিকের বাকস্বাধীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে চলমান দ্বন্দ্ব আরও একবার প্রকাশ্যে চলে এসেছে। পূর্বনির্ধারিত একটি শান্তিপূর্ণ জাতীয় পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার ঠিক আগমুহূর্তে বিরোধী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অন্যতম শীর্ষ নেতা ও আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকেকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ।

 

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর দুপুরে নয়াদিল্লির একটি আবাসিক এলাকা থেকে এই নাটকীয় আটকের ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিল্লিতে আয়োজিত ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ বা পতাকা উত্তোলন শীর্ষক একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালিতে যোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন দিপকে।

 

ঠিক সেই মুহূর্তেই তার অস্থায়ী বাসভবনে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মতো একটি দেশাত্মবোধক কর্মসূচিতে পুলিশি হস্তক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে।

 

আটকের মূল ঘটনার কিছুক্ষণ আগে থেকেই নয়াদিল্লির রাজনৈতিক ও সংবাদমাধ্যমের অঙ্গনে এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছিল। শুক্রবার দুপুরের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোতে একটি ভিডিও ফুটেজ এবং বেশ কিছু স্থিরচিত্র ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

 

আধুনিক ডিজিটাল যুগে রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে জনসমক্ষে চলে আসে, এই ভিডিওটি তার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ওই ভিডিওচিত্রে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখা যায়, দিল্লি পুলিশের একদল চৌকস ও সুসজ্জিত সদস্য একটি আবাসিক ভবনে প্রবেশ করছেন।

 

পুলিশের সেই আভিযানিক দলে পুরুষ সদস্যদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী পুলিশ সদস্যও উপস্থিত ছিলেন, যা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে পুলিশ যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য সম্পূর্ণ আইনি ও কৌশলগত প্রস্তুতি নিয়েই সেখানে উপস্থিত হয়েছিল।

 

প্রকাশিত ছবিগুলোতে দেখা যায়, একটি অত্যন্ত সুসজ্জিত বসার ঘরে অভিজিৎ দিপকের ঠিক মুখোমুখি একটি সোফায় বসে আছেন দিল্লি পুলিশের ইউনিফর্ম পরিহিত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তার হাতে বেশ কিছু আইনি কাগজপত্র ছিল, যা তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দিপকেকে বুঝিয়ে বলছিলেন এবং তাকে কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিচ্ছিলেন।

 

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ ভারতের একাধিক শীর্ষস্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের খবরে এই ঘটনার একটি বিস্তারিত প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়েছে। খবরে জানানো হয়, দিল্লি পুলিশ মূলত দিপকের বাসভবনে গিয়ে তাকে একটি আনুষ্ঠানিক আইনি নোটিশ প্রদান করছিল।

 

নোটিশের মূল উদ্দেশ্য ছিল দিপকে যেন বিকেল ৫টায় কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে আসেন। এখানে রাজনৈতিকভাবে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, দিপকে নয়াদিল্লির করোলবাগ এলাকার ঝান্ডেওয়ালায় যে বাড়িতে অবস্থান করছিলেন, সেটি তার নিজস্ব কোনো সম্পত্তি নয়।

 

ওই বাড়িটি মূলত ভারতের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি বা এনসিপি-এর (শরদ পাওয়ারপন্থী) শীর্ষ নেতা ও দলীয় মুখপাত্র অনীশ গাওয়ান্ডের নিজস্ব বাসভবন।

 

একজন বিরোধীদলীয় প্রভাবশালী নেতার বাড়িতে অবস্থানরত অপর একজন রাজনৈতিক কর্মীর ওপর সরাসরি পুলিশের এই পদক্ষেপ স্বাভাবিকভাবেই ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণকে আরও জটিল ও বিতর্কিত করে তুলেছে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী জোটের নেতাদের বাসভবনে এ ধরনের পুলিশি তৎপরতা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে, যা গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের পরিপন্থী। পুলিশের পক্ষ থেকে সেই সময় দিপকেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয় যে, শুক্রবার বিকেল ৫টায় নয়াদিল্লির কেন্দ্রস্থল কনট প্লেসের ঐতিহাসিক সেন্ট্রাল পার্কে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলনের যে বিশাল কর্মসূচি তিনি গ্রহণ করেছেন, তা যেন অবিলম্বে বাতিল করা হয়।

 

পুলিশ তাদের এই নির্দেশনার সপক্ষে শক্তিশালী ও সাম্প্রতিক আইনি যুক্তিও উপস্থাপন করে। পুলিশের পক্ষ থেকে দিপকেকে জানানো হয় যে, গোটা কনট প্লেস এবং এর আশপাশের বিস্তীর্ণ বাণিজ্যিক ও জনবহুল এলাকায় বর্তমানে ‘ভারতীয় ন্যায় সংহিতা’-এর ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে।

 

উল্লেখ্য, ভারতীয় আইনি ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সংস্কারের পর ব্রিটিশ আমলের ফৌজদারি কার্যবিধির পূর্বের ১৪৪ ধারার আধুনিক সমতুল্য হিসেবে এই ১৬৩ ধারা প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির বেআইনি জমায়েত কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা এবং জনশৃঙ্খলা ও শান্তি বজায় রাখা।

 

পুলিশ দিপকেকে বিনীতভাবে অথচ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে অনুরোধ করে, তিনি যেন একজন দায়িত্বশীল নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতা হিসেবে দেশের প্রচলিত আইনকানুন মেনে চলেন এবং রাজধানীর শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রশাসনকে সার্বিকভাবে সাহায্য করেন।

 

তবে ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে পুলিশের এই আইনি নোটিশ অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে পড়লেও, তাদের নির্দেশনার কাছে নতিস্বীকার করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় পুলিশ কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেন যে, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে শান্তিপূর্ণভাবে নিজস্ব জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা কোনোভাবেই বেআইনি বা রাষ্ট্রবিরোধী কাজ হতে পারে না।

 

এটি প্রত্যেক নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। তাই তিনি তার পূর্বনির্ধারিত ও ঘোষিত কর্মসূচি বাতিল করতে মোটেও রাজি নন। পুলিশের সঙ্গে তার এই দীর্ঘ ও তর্কবিতর্কপূর্ণ কথোপকথনের একটি ভিডিও ককরোচ জনতা পার্টির নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়, যা মুহূর্তের মধ্যে সাধারণ মানুষ ও নাগরিক সমাজের মনোযোগ আকর্ষণ করে।

 

ভারতের অন্যতম শীর্ষ সম্প্রচারমাধ্যম এনডিটিভিও তাদের সংবাদ বুলেটিন ও ওয়েবসাইটে ওই ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খবরটি প্রচার করে। সংবাদমাধ্যমগুলোর এই দ্রুত প্রচারণার ফলে পুলিশের এই পদক্ষেপ দেশব্যাপী একটি বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়।

 

পুলিশ প্রশাসন যখন চূড়ান্তভাবে বুঝতে পারে যে দিপকে কোনোভাবেই তাদের আইনি নির্দেশ মানবেন না এবং তার কর্মসূচি বাস্তবায়নে তিনি অবিচল, তখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সম্ভাব্য অবনতির আশঙ্কায় তারা কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়।

 

ফলশ্রুতিতে, পুলিশ তাকে নোটিশ দেওয়ার ঠিক কিছুক্ষণ পরেই ওই বাসভবন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আটক করে নিয়ে যায়। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো নয়াদিল্লির এই পরিস্থিতির দিকে অত্যন্ত সতর্ক ও নিবিড় দৃষ্টি রাখছে।

 

তাদের মতে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখা প্রশাসন ও সরকার উভয়ের জন্যই সবসময়ই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অভিজিৎ দিপকের এই আটকের ঘটনা সেই বহুল আলোচিত চ্যালেঞ্জকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

 

অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মতো একটি সম্পূর্ণ অহিংস ও জাতীয়তাবাদী কর্মসূচিতে বাধা প্রদান কি সত্যিই জনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে করা হয়েছে, নাকি এর পেছনে ভিন্ন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণ কাজ করছে।

 

কনট প্লেসের মতো একটি ঐতিহাসিক ও গণতান্ত্রিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে কঠোর বিধিনিষেধ জারি করে সাধারণ মানুষের শান্তিপূর্ণ জমায়েত ও মতপ্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী বলে অনেক প্রথিতযশা আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী মত প্রকাশ করেছেন।

 

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে সরকারের অসহিষ্ণু মনোভাবের সুস্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তাদের জোরালো দাবি, সরকার রাজনৈতিক ভিন্নমত দমনের জন্য এবং বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার জন্য পুলিশ প্রশাসনকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

 

ভবিষ্যতে এই চাঞ্চল্যকর আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লির রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে কি না, অথবা ককরোচ জনতা পার্টি তাদের পরবর্তী রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কী ধরনের প্রতিবাদ কর্মসূচি গ্রহণ করে, তা দেখার জন্য রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।

 

আপাতত অভিজিৎ দিপকে পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন এবং তার বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে পুলিশের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে। তবে এই ঘটনার রেশ যে ভারতের রাজনীতি, নাগরিক অধিকার আন্দোলন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ইতিহাসে একটি সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

 

- এনডিটিভি