রোববার দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে ঘটা এই আকস্মিক সংঘাতের কারণে পুরো এলাকায় মারাত্মক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। দেশের অন্যতম ব্যস্ত এই সড়কটিতে হঠাৎ শিক্ষার্থীদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের ফলে যানবাহন চলাচল পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়ে।
এর প্রভাব পড়ে আশপাশের বিভিন্ন সড়কগুলোতেও, যার ফলে দীর্ঘসময় জুড়ে চরম যানজট ও তীব্র জনভোগান্তির সৃষ্টি হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের নিরপেক্ষতা ও পেশাদার মান বজায় রেখে সংগৃহীত তথ্যে জানা যায়, ছুটির পর সাধারণ যাতায়াতের সময় শুরু হওয়া এই বিবাদ মুহূর্তের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রূপ নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, প্রতি রবিবারের মতো সেদিনও ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শ্রেণি কার্যক্রম শেষে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী নিজ নিজ গন্তব্যে ফেরার জন্য সায়েন্সল্যাব ও গ্রিন রোড এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন।
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে কোনো এক তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে উভয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মুখোমুখি অবস্থান গ্রহণ করেন এবং পারস্পরিক ইট-পাটকেল নিক্ষেপে জড়িয়ে পড়েন।
সায়েন্সল্যাব মোড়টি মিরপুর রোড, এলিফ্যান্ট রোড এবং ধানমন্ডি এলাকার যাতায়াতের প্রধান পথ হওয়ায় সংঘাতের সাথে সাথেই সবকটি প্রবেশমুখে তীব্র যানজট তৈরি হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় মূল সড়কে আটকে পড়ে অ্যাম্বুলেন্সসহ অসংখ্য জরুরি সেবার যানবাহন।
পথচারী ও আশপাশের ব্যবসায়ীরা প্রাণভয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে যান এবং সংলগ্ন দোকানপাট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়ে ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থী হাবিব জানান, তাঁদের নিয়মিত পাঠদান শেষে শিক্ষার্থীরা কলেজের বাসে করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।
বাসটি সায়েন্সল্যাব অতিক্রম করে গ্রিন রোডের মোড়ে পৌঁছালে পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। হাবিবের ভাষ্যমতে, আইডিয়াল কলেজের একদল শিক্ষার্থী কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই বাসের ওপর ইট-পাটকেল ছড়তে শুরু করে।
এতে বাসের জানালার বেশ কয়েকটি কাচ ভেঙে চুরমার হয়ে যায় এবং বাসের ভেতরে থাকা শিক্ষার্থীরা চরম আতঙ্কের মধ্যে পড়েন। বাসে হামলার এই সংবাদ নিমেষেই ঢাকা কলেজের প্রধান ক্যাম্পাসে পৌঁছালে শিক্ষার্থীরা সংক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
এরপর তারা সহপাঠীদের সুরক্ষা এবং হামলাকারীদের প্রতিহত করতে সায়েন্সল্যাব এলাকায় ছুটে আসেন, যার ফলে সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে সম্পূর্ণ বিপরীত বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইডিয়াল কলেজের এক শিক্ষার্থী।
আতঙ্কের কথা বিবেচনা করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীরা শ্রেণি কার্যক্রম শেষে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে নিজ নিজ বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে সড়ক সংলগ্ন এলাকায় অপেক্ষা করছিলেন।
এমন সময় ঢাকা কলেজের একদল শিক্ষার্থী আকস্মিকভাবে তাঁদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ও বেপরোয়া হামলা চালায়। হামলাটির মূল কারণ সম্পর্কে তিনি সম্পূর্ণ অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ওই শিক্ষার্থী আক্ষেপ করে বলেন যে, তারা সম্প্রতি কলেজে ভর্তি হওয়া নবীন শিক্ষার্থী এবং এ ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতা তাঁদের আগে কখনো ছিল না।
আক্রমণে আইডিয়াল কলেজের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে এবং মাথা ফেটে রক্তপাত হয়েছে। নিরাপত্তা নিয়ে চরম আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি জানান, সাধারণ শিক্ষার্থীরা এখন মারাত্মক মানসিকভাবে আতঙ্কিত ও নিজেদের সুরক্ষা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।
সংঘর্ষের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে ইলিয়াস আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ঢাকা কলেজের নিয়মিত শিক্ষার্থীবাহী বাসটি সাইন্সল্যাব এলাকা দিয়ে অতিক্রম করার সময় ল্যাবএইড হাসপাতালের সামনের সড়কে আইডিয়াল কলেজের কিছু শিক্ষার্থী বাসে ভাঙচুরের চেষ্টা চালায়।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত হামলার জেরে দুই কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে, যার ফলে ঢাকা কলেজের অন্তত তিনজন শিক্ষার্থী আঘাতপ্রাপ্ত ও আহত হয়েছেন। অধ্যক্ষ আরও বিস্তারিত উল্লেখ করে জানান যে, এই ধরণের সংঘাতময় পরিস্থিতির আশঙ্কায় কলেজ প্রশাসন সকাল থেকেই যথেষ্ট সচেতন ছিল।
সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এড়াতে সকাল থেকেই তারা স্থানীয় নিউমার্কেট থানা এবং ধানমন্ডি থানা পুলিশের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রক্ষা করছিলেন। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবেলায় পুলিশকে আগাম সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
এ ছাড়া সংঘর্ষের সূচনালগ্নেই কলেজ থেকে জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের একটি দল সায়েন্সল্যাবে পাঠানো হয়েছিল, যেন তারা উপস্থিত থেকে শিক্ষার্থীদের বুঝিয়ে শান্ত করতে পারেন এবং সংঘাত থেকে বিরত রেখে দ্রুত ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনতে পারেন।
উল্লেখ্য যে, ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট সংলগ্ন এই কৌশলগত এলাকায় ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘাতের ইতিহাস নতুন নয়। ইতিপূর্বেও নানা সময়ে অত্যন্ত তুচ্ছ কারণ, যাতায়াতের বাসে সীমানা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব কিংবা ব্যক্তিগত বিবাদকে কেন্দ্র করে এই দুটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা একাধিকবার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছেন।
ভৌগোলিক অবস্থানগত নৈকট্যের কারণে সাইন্সল্যাব মোড়টি উভয় কলেজের শিক্ষার্থীদের চলাচলের মূল কেন্দ্রস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যার ফলে যেকোনো ক্ষুদ্র ঘটনাও খুব দ্রুত বড় ধরনের সংঘর্ষে মোড় নেয়।
স্থানীয় স্থায়ী বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিবার সংঘর্ষের পর সাময়িক পুলিশি পদক্ষেপ নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদে কোনো স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া যায়নি। বারবার ঘটা এই সহিংসতা কেবল শিক্ষার্থীদের মূল্যবান শিক্ষাজীবনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং ওই এলাকার সার্বিক পরিবেশ এবং জাতীয় পর্যায়ের যাতায়াত ব্যবস্থাকেও নিয়মিতভাবে থমকে দিচ্ছে।
ঘটনা শুরু হওয়ার পরপরই পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে নিউমার্কেট ও ধানমন্ডি থানার অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টায় সংঘর্ষে লিপ্ত শিক্ষার্থীদের সড়ক থেকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া সম্ভব হয়।
পুলিশের মধ্যস্থতায় এবং ঢাকা কলেজ ও আইডিয়াল কলেজের শিক্ষকবৃন্দের সহায়তায় বেলা ১টার পর পরিস্থিতি শান্ত হতে শুরু করে এবং সড়কে যানচলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে আসে।
ধানমন্ডি ও নিউমার্কেট থানা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, যেকোনো নতুন অপ্রীতিকর ঘটনা প্রতিরোধে সায়েন্সল্যাব ও আশপাশের স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
দুই প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা চলছে এবং সহিংসতার প্রকৃত উৎস উদঘাটনে প্রয়োজনীয় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ঘটনাটি কেবল দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় বিশৃঙ্খলা নয়, বরং রাজধানীর সার্বিক জননিরাপত্তা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
রাজধানী ঢাকার অতি গুরুত্বপূর্ণ এই সংযোগস্থলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করেন, যার মধ্যে ল্যাবএইড হাসপাতালসহ আশপাশের বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে আসা সংকটাপন্ন রোগীরাও অন্তর্ভুক্ত থাকেন। তাই এ ধরনের আকস্মিক সংঘাত পুরো নগরজীবনকে স্থবির করে দেয়।
সুশীল সমাজ ও শিক্ষাবিদদের মতে, এই দীর্ঘদিনের পুরোনো সংঘাতের স্থায়ী অবসানের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বলপ্রয়োগের পাশাপাশি উভয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষক এবং অভিভাবকদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। তরুণ শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে দায়িত্বশীল ও সহনশীল করে গড়ে তোলা ছাড়া এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতার স্থায়ী নিরসন সম্ভব নয়।