চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন সারা দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। এই অপেক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে খুব শিগগিরই।
বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আগামী ৭ থেকে ১৫ নভেম্বরের মধ্যে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের জন্য জোর প্রস্তুতি গ্রহণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ফলাফল প্রস্তুত করার সার্বিক কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান গণমাধ্যমের কাছে এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি অত্যন্ত আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নভেম্বরের ৭ থেকে ১৫ তারিখের মধ্যেই ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব হবে বলে তারা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন। লাখ লাখ শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র মূল্যায়ন, নম্বর সমন্বয় এবং তা নির্ভুলভাবে প্রযুক্তির সহায়তায় কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষণ করার মতো একটি বিশাল ও জটিল কর্মযজ্ঞ বর্তমানে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করা হচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডগুলো সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে এই প্রক্রিয়া তদারকি করছে, যাতে কোনো ধরনের ত্রুটি বা অসঙ্গতি ছাড়াই শিক্ষার্থীদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা যায়।
চলতি বছরের পরীক্ষা প্রক্রিয়ায় একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক এবং দুর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়ার কারণে প্রায়শই বিভিন্ন খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এবার চট্টগ্রাম অঞ্চলে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে বেশ কয়েকটি বিষয়ের লিখিত পরীক্ষা পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা এবং বিরূপ পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়ে ওই পরীক্ষাগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল।
পরবর্তীতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলো পুনরায় গ্রহণ করা হয় এবং ৯ সেপ্টেম্বর তা সফলভাবে সম্পন্ন হয়। তবে এই বিলম্বের কারণে ফলাফল প্রকাশে যেন কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি রেখেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল প্রস্তুত করার কাজে বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে অতিরিক্ত পরীক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে উত্তরপত্র মূল্যায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যাতে সারা দেশের সব বোর্ডের ফলাফল একই সঙ্গে এবং নির্ধারিত সম্ভাব্য সময়ের মধ্যেই প্রকাশ করা সম্ভব হয়।
প্রাথমিক সময়সূচি অনুযায়ী, সারা দেশে চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছিল গত ২ জুলাই। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী অত্যন্ত শৃঙ্খলার সঙ্গে এই লিখিত পরীক্ষাগুলো ৮ আগস্টের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
তদুপরি, ব্যবহারিক পরীক্ষাগুলোও ১৫ আগস্টের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। দেশের অধিকাংশ শিক্ষা বোর্ড এই সময়সূচি সফলভাবে অনুসরণ করতে সক্ষম হলেও কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে কিছুটা ছন্দপতন ঘটে।
তা সত্ত্বেও, শিক্ষা বোর্ডগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এবং দূরদর্শী পরিকল্পনার ফলে পুরো পরিস্থিতি খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
এইচএসসি পরীক্ষা শুধু একটি সাধারণ পরীক্ষা নয়, বরং এটি দেশের সবচেয়ে বড় সর্বজনীন পরীক্ষাগুলোর মধ্যে অন্যতম। চলতি বছর সারা দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন।
দেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা ৯ হাজার ৪৩৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য সারা দেশে মোট ২ হাজার ৬৯৭টি পরীক্ষাকেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছিল। এই পরিসংখ্যান থেকেই অনুধাবন করা যায় যে, কত বড় একটি বিশাল কর্মযজ্ঞের মাধ্যমে এই পরীক্ষাগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।
এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন হাজার হাজার শিক্ষক, পরিদর্শক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে পরীক্ষা গ্রহণ সম্ভব হয়েছে।
পরীক্ষার্থীদের বিভাজনের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, দেশের নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছেন। এই সাধারণ বোর্ডগুলো থেকে মোট ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন।
তাদের জন্য সারা দেশে ১ হাজার ৬২৬টি পরীক্ষাকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রতিটি কেন্দ্রেই শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছিল। সাধারণ বোর্ডগুলোর এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর ফলাফল মূল্যায়ন করা একটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, তবে নিয়োজিত পরীক্ষকরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে তাদের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের পাশাপাশি মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনেও বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে পরিচালিত মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে আলিম পরীক্ষায় এবার ৯২ হাজার ৯০৫ জন শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেছেন।
তাদের জন্য সারা দেশে ৪৬১টি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছিল। অন্যদিকে, দেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ভোকেশনাল ও অন্যান্য সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন শিক্ষার্থী।
কারিগরি বোর্ডের এই শিক্ষার্থীদের জন্য দেশব্যাপী ৬১০টি পরীক্ষাকেন্দ্রের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দেশের সার্বিক উন্নয়নে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষার এই বিস্তৃতি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক একটি দিক।
এবারের পরীক্ষায় শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যে পরীক্ষার্থীর সংখ্যার দিক থেকে বরাবরের মতোই শীর্ষে অবস্থান করছে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। রাজধানীসহ আশপাশের বিশাল এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এখানে পরীক্ষার্থীর চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে।
চলতি বছর ঢাকা শিক্ষা বোর্ড থেকে ৩ লাখ ৩৯৩ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন, যারা মোট ৩১০টি কেন্দ্রে পরীক্ষা দিয়েছেন। অন্যান্য বোর্ডগুলোর মধ্যেও ছিল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরীক্ষার্থীর উপস্থিতি।
যেমন, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার ৮৩০ জন, যশোর শিক্ষা বোর্ড থেকে ১ লাখ ১৭ হাজার ২১০ জন এবং দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছেন।
এর বাইরে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কবলিত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড থেকে এবার পরীক্ষায় বসেছিলেন ৯৯ হাজার ৬৮৮ জন শিক্ষার্থী। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে এই সংখ্যা ছিল ৯৪ হাজার ৮০২ জন। এছাড়া ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে ৭৩ হাজার ৩৭ জন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ৭১ হাজার ৭১১ জন এবং দক্ষিণাঞ্চলের বরিশাল শিক্ষা বোর্ড থেকে ৫৮ হাজার ৬৬৪ জন পরীক্ষার্থী এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রাখতে অংশ নিয়েছেন।
প্রতিটি বোর্ডের এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর উত্তরপত্র সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে একটি অভিন্ন ও নির্ভুল ফলাফল প্রস্তুত করা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা তারা অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করছেন।
উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই মূলত শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ জীবনের গতিপথ নির্ধারিত হয়। এই ফলাফলের ভিত্তিতেই তারা দেশের বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পেয়ে থাকেন।
তাই এই ফলাফল শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আগামী নভেম্বরে যখন এই ফল প্রকাশিত হবে, তখন তা লাখো শিক্ষার্থীর জীবনে নতুন স্বপ্নের দুয়ার খুলে দেবে। বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি অত্যন্ত স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নির্ভুলতার সঙ্গে এই ফলাফল প্রকাশের জন্য দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে।
আশা করা যায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই একটি সফল এবং ত্রুটিমুক্ত ফলাফল আমরা দেখতে পাব, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে আরও সুদৃঢ় করবে এবং শিক্ষার্থীদের সোনালী ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করবে।