স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে গত চব্বিশ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জন রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ের মধ্যে প্রাণঘাতী এই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার পাঁচশত একষট্টি জন নতুন রোগী।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, বাংলাদেশের বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা মোকাবিলায় জরুরি ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
রোববার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে দেশের এই উদ্বেগজনক স্বাস্থ্য পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরা হয়। সরকারি এই পরিসংখ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে দেশজুড়ে এ পর্যন্ত মোট একশত ঊনপঞ্চাশ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।
মৃত্যুর এই পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক দিক হলো সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকের পরিস্থিতি। কেবল সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম বারো দিনেই বায়ান্ন জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যা চলতি বছরে যেকোনো একক মাসের তুলনামূলক হিসাবে সর্বোচ্চ মৃত্যুর হারের ইঙ্গিত দেয়।
এর আগে আগস্ট মাসে তেতাল্লিশ জন, জুলাই মাসে ছত্রিশ জন এবং জুন মাসে তেরোজন রোগীর মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া বছরের প্রথমার্ধে মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুজন করে মোট চারজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
মাসের পর মাস মৃত্যুর এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে, সময় গড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব আরও বেশি প্রাণঘাতী ও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে। সংক্রমণের হারের দিকে দৃষ্টিপাত করলেও এই স্বাস্থ্য সংকটের ভয়াবহতা সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক তথ্যমতে, শনিবার সকাল আটটা থেকে রোববার সকাল আটটা পর্যন্ত এই চব্বিশ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে এক হাজার পাঁচশত একষট্টি জন নতুন রোগী ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর ভর্তি হয়েছেন।
এর ফলে চলতি বছর ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া মোট রোগীর সংখ্যা পঞ্চাশ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এ পর্যন্ত মোট একান্ন হাজার আটশত সাঁইত্রিশ জন রোগী ডেঙ্গু নিয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
তবে আশার কথা হলো, চিকিৎসকদের নিরলস প্রচেষ্টায় বিপুলসংখ্যক মানুষ সুস্থতাও লাভ করছেন। গত চব্বিশ ঘণ্টায় চিকিৎসাকেন্দ্রগুলো থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন এক হাজার তিনশত চুরানব্বই জন রোগী।
সব মিলিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসা শেষে নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন আটচল্লিশ হাজার তিরানব্বই জন। তা সত্ত্বেও, প্রতিদিন যে হারে নতুন রোগী হাসপাতালে আসছেন, তাতে দেশের সার্বিক চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
দেশের প্রধান সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে এখন রোগীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক চিকিৎসাকেন্দ্রেই তীব্র শয্যাসংকটের কারণে মেঝেতে বা বারান্দায় অস্থায়ীভাবে শয্যা স্থাপন করে রোগীদের চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে বাধ্য হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকর্মীরা।
চিকিৎসক ও সেবিকারা দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেলেও, রোগীর এই মাত্রাতিরিক্ত চাপ সামলাতে গোটা স্বাস্থ্য কাঠামোকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে ডেঙ্গুর নেতিবাচক প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর আকার ধারণ করছে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই জ্বর কমে যাওয়ার পর রক্তক্ষরণজনিত ডেঙ্গু জ্বর বা মারাত্মক শারীরিক বিপর্যয়ের মতো জটিলতা দেখা দিচ্ছে। এর ফলে রোগীর অবস্থার আকস্মিক অবনতি ঘটছে এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
এ কারণে চিকিৎসকেরা জ্বর হওয়ার প্রথম দিন থেকেই ডেঙ্গু পরীক্ষার পাশাপাশি রক্তচাপ ও রক্তে অণুচক্রিকার মাত্রা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করছেন। ডেঙ্গুর এই প্রাদুর্ভাব এখন আর কেবল রাজধানী ঢাকার সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি সমগ্র দেশে একটি জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।
গত চব্বিশ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের আঞ্চলিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখনো সর্বোচ্চ সংক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে অবস্থান করছে ঢাকা বিভাগ। এই অতি অল্প সময়ের মধ্যে কেবল ঢাকা বিভাগেই ছয়শত সাতাশ জন রোগী ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
তবে ঢাকার বাইরের পরিস্থিতিও যথেষ্ট উদ্বেগজনক ও শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগে দুইশত পঁচাত্তর জন এবং বরিশাল বিভাগে দুইশত দুইজন রোগী বর্তমানে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে একশত একাশি জন, রাজশাহী বিভাগে একশত চারজন, ময়মনসিংহ বিভাগে তিরানব্বই জন, রংপুর বিভাগে তিহাত্তর জন এবং সিলেট বিভাগে ছয়জন রোগী গত চব্বিশ ঘণ্টায় হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হয়েছেন।
এই বিস্তীর্ণ ও দেশব্যাপী সংক্রমণ চিত্র অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, দেশের প্রায় প্রতিটি অঞ্চলেই এডিস মশার প্রজনন ও বিস্তার চরম আকার ধারণ করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাব এবং থেমে থেমে বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা মূলত এডিস মশার বংশবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর মানদণ্ড অনুযায়ী, এ ধরনের মহামারি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কেবল চিকিৎসাকেন্দ্র বা হাসপাতালগুলোর ওপর নির্ভর করলেই চূড়ান্ত সমাধান সম্ভব নয়। বরং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে দেশব্যাপী সমন্বিত মশা নিধন কার্যক্রম পরিচালনা এবং নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
বাড়ির চারপাশ পরিচ্ছন্ন রাখা, জমে থাকা পানি নিয়মিত নিষ্কাশন করা এবং জ্বর হলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি উদ্যোগী হতে হবে। বর্তমান এই জাতীয় সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারি নীতিনির্ধারক, স্থানীয় প্রশাসন এবং দেশের প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত ও ঐক্যবদ্ধ প্রয়াসের কোনো বিকল্প নেই।