মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি, এক দিনে আটজনের মৃত্যু

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম

দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতি, এক দিনে আটজনের মৃত্যু
ছবি: সংগৃহীত

সারাদেশে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে আরও আটজনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং একই সময়ে চিকিৎসার জন্য বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার পাঁচশত তিরানব্বই জন রোগী।

 

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত স্বাস্থ্য বুলেটিনে এই তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষার শেষভাগে এসে ডেঙ্গুর বিস্তার ও তীব্রতা মারাত্মক রূপ নিচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সর্বমোট একশত চৌষট্টি জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। বিগত কয়েক মাসের তথ্য পর্যালোচনা করলে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতির স্পষ্ট চিত্র ফুটে ওঠে।

 

বছরের শুরুর দিকে পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মধ্যভাগ থেকে মৃত্যুর হার ক্রমাগত বাড়তে থাকে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম চৌদ্দ দিনেই প্রাণ হারিয়েছেন সাতষট্টি জন রোগী, যা চলতি বছরের যেকোনো মাসের তুলনায় দৈনিক মৃত্যুর দিক থেকে সর্বোচ্চ।

 

এর আগে আগস্ট মাসজুড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে তেতাল্লিশ জনের মৃত্যু হয়েছিল। এছাড়া জুলাই মাসে ছত্রিশ জন, জুন মাসে তেরোজন এবং মে মাসে একজনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়। বছরের শুরুতে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে দুজন করে মারা গিয়েছিলেন।

 

মাসের ব্যবধানে মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা পরিস্থিতিকে ক্রমশ জটিল করে তুলছে। হাসপাতালে ভর্তির হার পর্যালোচনায় জানা গেছে, সোমবার সকাল আটটা থেকে পরবর্তী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে নতুন করে এক হাজার পাঁচশত তিরানব্বই জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।

 

নতুন এই রোগীদের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে চলতি বছরে হাসপাতালে মোট ভর্তি হওয়া ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পঞ্চান্ন হাজার একশত তেষট্টি জনে। তবে আশার বিষয় হলো, আক্রান্তদের মধ্যে একটি বড় অংশ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন।

 

গত চব্বিশ ঘণ্টায় সারাদেশে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন এক হাজার পাঁচশত ছেষট্টি জন মানুষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর এখন পর্যন্ত মোট পঞ্চাশ হাজার নয়শত একচল্লিশ জন রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছেন।

 

সুস্থতার হার বেশি হলেও প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক নতুন রোগীর আগমন হাসপাতালগুলোর শয্যা ও চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। ভৌগোলিক বিস্তার বিবেচনা করলে দেখা যায়, এডিস মশাবাহিত এই রোগটি এখন আর কেবল নির্দিষ্ট কোনো নগরে সীমাবদ্ধ নেই, বরং দেশের প্রায় প্রতিটি বিভাগেই এর সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত চব্বিশ ঘণ্টায় দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে, যার সংখ্যা পাঁচশত ছিয়াশি জন। রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে মশার উপদ্রব বৃদ্ধির কারণে এখানে রোগীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেশি থাকছে।

 

ঢাকার পরই সর্বোচ্চ সংক্রমণের শিকার হয়েছে খুলনা বিভাগ, যেখানে একদিনে দুইশত নব্বই জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া চট্টগ্রাম বিভাগে একশত পঁয়ষট্টি জন, বরিশাল বিভাগে একশত উনষাট জন এবং রাজশাহী বিভাগে একশত আটত্রিশ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

 

অন্যদিকে তুলনামূলক কম হলেও ময়মনসিংহ বিভাগে বিরাশি জন এবং রংপুর বিভাগে পঁয়ষট্টি জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। বিভাগীয় এই পরিসংখ্যান নির্দেশ করে যে, মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ডেঙ্গুর সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বিস্তার লাভ করছে।

 

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং তাৎক্ষণিক সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ সবচেয়ে বেশি জরুরি। তীব্র জ্বর, শরীর ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা বা শরীরে কোনো ধরনের রক্তক্ষরণের লক্ষণ দেখা দিলে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

 

পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি ও তরল খাবার গ্রহণ এবং রক্তের প্লাটিলেট ও রক্তচাপের ওপর নিয়মিত নজর রাখা প্রয়োজন। একইসঙ্গে বাড়ির আশপাশে জমে থাকা স্বচ্ছ পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা এবং মশার বংশবিস্তার রোধে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণই ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রধান উপায়।