রবিবার, অক্টোবর ৪, ২০২৬
১৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটি, সাপ্তাহিক বন্ধ মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন ১০ থেকে ১৬ দিনের অবকাশ

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম

দুর্গাপূজার দীর্ঘ ছুটি, সাপ্তাহিক বন্ধ মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা পাচ্ছেন ১০ থেকে ১৬ দিনের অবকাশ
ছবি: সংগৃহীত

শরতের শুভ্র কাশফুল আর নীল আকাশের স্নিগ্ধতার মাঝেই বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা ধ্বনিত হচ্ছে সারা দেশে। আর এই উৎসবের আনন্দঘন মাত্রাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ঘোষণা করা হয়েছে অভাবনীয় এক দীর্ঘ ছুটির।

 

সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উচ্চমাধ্যমিক কলেজ এবং মাদরাসার পূর্বনির্ধারিত বার্ষিক ছুটির তালিকার সাথে নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটির এক অপূর্ব সমন্বয়ে এবার শিক্ষার্থীরা প্রতিষ্ঠানভেদে টানা দশ থেকে ষোলো দিন পর্যন্ত দীর্ঘ এক অবকাশ যাপনের সুযোগ পাচ্ছেন।

 

তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধরন, প্রশাসনিক কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের ভিন্নতার কারণে এই ছুটির সময়কাল দেশের সর্বত্র একই রকম হচ্ছে না। জাতীয় শিক্ষাবর্ষপঞ্জি এবং সরকারি প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে প্রণীত ছুটির এই দীর্ঘায়িত রূপ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মাঝে ইতোমধ্যে ব্যাপক উৎসাহ, উদ্দীপনা ও স্বস্তির জন্ম দিয়েছে।

 

দীর্ঘ একটি বছর পড়াশোনার একঘেয়েমি আর মানসিক চাপের পর এই দীর্ঘ বিরতি শিক্ষার্থীদের নতুন উদ্যমে পড়াশোনায় ফিরতে সাহায্য করবে বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষকরা।

 

চলতি ২০২৬ সালের জন্য প্রণীত সরকারি, বেসরকারি মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর বার্ষিক ছুটির তালিকা নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে ১৮ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত মোট পাঁচ দিনের ছুটি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

 

তবে এই পাঁচ দিনের মূল ছুটির সাথে অত্যন্ত চমৎকারভাবে যুক্ত হচ্ছে আগে ও পরের সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো, যা মূলত এই অবকাশকে একটি দীর্ঘ রূপ দান করেছে। সরকারি ছুটির ঠিক আগেই ১৬ ও ১৭ অক্টোবর যথাক্রমে শুক্রবার এবং শনিবার হওয়ায় শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই ওই দুই দিন সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করবেন।

 

আবার পূজার নির্ধারিত পাঁচ দিনের সরকারি ছুটি শেষ হওয়ার পরপরই ২৩ ও ২৪ অক্টোবর পুনরায় শুক্রবার ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি এসে যুক্ত হচ্ছে। এর ঠিক পরদিন অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর রোববার লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ থাকবে।

 

সব মিলিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হিসাব করলে দেখা যায়, ১৬ অক্টোবর থেকে শুরু করে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত টানা দশ দিনের একটি নিরবচ্ছিন্ন ছুটি উপভোগ করার অভাবনীয় সুযোগ পাচ্ছেন মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা।

 

তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা অধিদপ্তর প্রশাসনিক প্রয়োজনে বা সিলেবাস সম্পন্ন করার তাগিদে অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার বা শিক্ষাবর্ষপঞ্জির কিছুটা রদবদল ঘটাতে পারে। তাই ছুটির এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য শিক্ষার্থীদের স্ব স্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে।

 

মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর তুলনায় উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের কলেজগুলোতে এই ছুটির ব্যাপ্তি আরও অনেক বেশি দীর্ঘ, প্রসারিত ও আনন্দদায়ক হতে চলেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের কলেজ শাখার প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক ছুটির তালিকা অনুযায়ী, দুর্গাপূজা, বিজয়া দশমী, বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রবারণা পূর্ণিমা এবং সবশেষে লক্ষ্মীপূজা-এই সবগুলো উৎসবকে একত্রিত করে ১৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ছুটির সুস্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে।

 

তবে এই নির্ধারিত ছুটির হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে সরকারি নিয়মানুযায়ী সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলো। পূর্ববর্তী সাপ্তাহিক ছুটি ১৬ ও ১৭ অক্টোবরের পর ১৮ তারিখ থেকে শুরু হবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল ছুটি, যা একটানা চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত।

 

এরপর ৩০ ও ৩১ অক্টোবর আবারো যথাক্রমে শুক্রবার ও শনিবার হওয়ায় কলেজের শিক্ষার্থীরা সব মিলিয়ে ১৬ অক্টোবর থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত টানা ষোলো দিনের এক বিশাল অবকাশ পাচ্ছেন। উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত অনেক শিক্ষার্থীই নিজেদের বাড়ি ছেড়ে দূরে ছাত্রাবাসে বা ভাড়াবাড়িতে অবস্থান করে পড়াশোনা করেন।

 

এই দীর্ঘ ছুটি তাদের জন্য রাজধানী বা শহর ছেড়ে পরিবার-পরিজনের সাথে মিলিত হওয়ার এবং উৎসবের আনন্দ পরিপূর্ণভাবে ভাগাভাগি করে নেওয়ার এক অনন্য সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিশাল প্রশাসনিক কাঠামো সচল রাখা সরকারি চাকরিজীবীদের জন্যও এবার দুর্গাপূজার ছুটিতে বিশেষ সুখবর ও স্বস্তির বার্তা রয়েছে।

 

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পূর্বনির্ধারিত সরকারি ছুটির তালিকা অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বুধবার বিজয়া দশমী উপলক্ষ্যে সাধারণ ছুটি আগেই নির্ধারিত ছিল। কিন্তু উৎসবের আনন্দকে আরও নির্বিঘ্ন করতে এবং নাগরিক সুবিধাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সরকার ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবারকে বিশেষ নির্বাহী আদেশে ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেছে।

 

সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই নির্বাহী আদেশের ফলে সরকারি চাকরিজীবীরা ২০ থেকে ২২ তারিখ পর্যন্ত টানা তিন দিনের সরকারি ছুটি পাচ্ছেন। আর এর পরপরই ২৩ ও ২৪ অক্টোবর যথাক্রমে শুক্রবার ও শনিবারের নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় সব মিলিয়ে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য টানা পাঁচ দিনের একটি চমৎকার ও নিরবচ্ছিন্ন ছুটির প্যাকেজ তৈরি হয়েছে।

 

প্রশাসনিক বিশ্লেষক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের এই নির্বাহী আদেশে ছুটি ঘোষণার ফলে উৎসবের সময় যাতায়াতের ক্ষেত্রে মহাসড়ক, রেলপথ ও নৌপথে যে ব্যাপক ভিড় ও অসহনীয় যানজট তৈরি হয়, তা অনেকাংশে হ্রাস পাবে এবং সাধারণ মানুষজন অনেক স্বাচ্ছন্দ্যে ও নিরাপদে নিজ নিজ গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন।

 

দেশের অন্যান্য সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা মাদরাসাগুলোর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্যও পূজার এই উৎসবমুখর সময়ে ছুটির সুস্পষ্ট বিধান রাখা হয়েছে। মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকাশিত সরকারি ছুটির তালিকা এবং প্রশাসনিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি, এমপিওভুক্ত এবং ইবতেদায়ী মাদরাসায় ২০ অক্টোবর থেকে ২২ অক্টোবর পর্যন্ত মোট তিন দিনের আনুষ্ঠানিক ছুটি নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

যেহেতু মাদরাসাগুলোর শিক্ষাবর্ষপঞ্জি এবং অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম সাধারণ স্কুল-কলেজ থেকে কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির হয়ে থাকে, তাই তাদের ছুটির কাঠামোটিও সম্পূর্ণ নিজস্ব নিয়মে পরিচালিত হয়।

 

তবে এই তিন দিনের ছুটির সাথে যদি আগে বা পরের সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ার কোনো প্রশাসনিক সুযোগ থাকে, তবে মাদরাসার শিক্ষার্থীরাও স্বাভাবিকভাবেই অতিরিক্ত ছুটির আনন্দ উপভোগ করতে পারবেন।

 

এই ধরনের ছুটির কাঠামোর মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের বুকে সকল ধর্মের উৎসবের সময় একটি সর্বজনীন ছুটির আমেজ বজায় থাকে, যা দেশের আবহমান কালের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়।

 

অন্যদিকে, দেশের উচ্চশিক্ষার সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছুটির চিত্র একেবারেই ভিন্ন এবং অনেকটাই প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক ও স্বাধীন। বাংলাদেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাধারণ সরকারি ছুটির তালিকা সরাসরি বা হুবহু প্রযোজ্য হয় না।

 

এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয় এবং এদের নিজস্ব সিন্ডিকেট ও অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের মাধ্যমে বার্ষিক ছুটির তালিকা বা শিক্ষাবর্ষপঞ্জি চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

 

যে কারণে দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ছুটির সময়কাল সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় হয়তো সরকারের সাধারণ ছুটির সাথে সামঞ্জস্য রেখে তাদের ছুটির দিনক্ষণ নির্ধারণ করবে, আবার কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয় তাদের নিজস্ব চলমান সেমিস্টার, ক্লাস, পরীক্ষার সূচি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে এর আগে বা পরে অতিরিক্ত ছুটি মঞ্জুর করতে পারে।

 

এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলো খোলা বা বন্ধ রাখার বিষয়টিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নিজস্ব ও স্বাধীন সিদ্ধান্তের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। তাই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের দুর্গাপূজার ছুটি ঠিক কত দিনের হবে, তা নিশ্চিতভাবে জানার জন্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পৃথক ও আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে।

 

সার্বিকভাবে বিচার ও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরগুলোতে যে দীর্ঘ ছুটির আমেজ তৈরি হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন যান্ত্রিক ও কর্মব্যস্ত জীবনে এক পশলা প্রশান্তির বৃষ্টি হয়ে ধরা দিয়েছে।

 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর এমন দীর্ঘ ছুটি শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদেরই আনন্দিত ও উজ্জীবিত করছে না, বরং তা দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন খাত, পরিবহন খাত এবং সার্বিক গ্রামীণ অর্থনীতিতেও একটি অত্যন্ত ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে দৃঢ়ভাবে আশা করা যায়।

 

দীর্ঘ এই অবকাশে অনেকেই পরিবারসহ দেশের বিভিন্ন দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্রে প্রমোদভ্রমণে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, আবার অনেকেই নাড়ির টানে শহর ছেড়ে ফিরে যাবেন শেকড়ের কাছে, গ্রামের চিরচেনা বাড়িতে।

 

প্রশাসনিক উচ্চস্তর থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন পর্যন্ত সর্বত্রই এই ছুটির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রমাণ করে যে, জাতীয় উৎসব উদযাপনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র কতটা সংবেদনশীল, আন্তরিক ও নাগরিকবান্ধব দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।

 

সকল ধর্মের ও বর্ণের মানুষের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং গভীর সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে এবারের শারদীয় উৎসব এবং তৎসংলগ্ন এই দীর্ঘ অবকাশ সবার জন্য এক অনাবিল আনন্দ, মানসিক প্রশান্তি ও নিরাপদ পারিবারিক পুনর্মিলনের এক অবিস্মরণীয় স্মৃতি হয়ে থাকবে।