শুক্রবার, ২৬ জুন, রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত ‘ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অধিকার’ শীর্ষক এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দেন সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে সরকারের এই পদক্ষেপ মানবাধিকার পুনরুদ্ধার, জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠিত এই জাতীয় সংলাপে বিগত শাসনামলে গুমের শিকার হওয়া অসংখ্য মানুষের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর প্রতি গভীর সমবেদনা ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন।
তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, রাষ্ট্রের তরফ থেকে কেবল আর্থিক সহায়তাই নয়, বরং গুমের মতো মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধের শিকার হওয়া প্রতিটি ব্যক্তির ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার সম্পূর্ণভাবে বদ্ধপরিকর।
এই অমানবিক অপরাধের সঙ্গে যারা সরাসরি যুক্ত ছিলেন, যারা নেপথ্যে থেকে নির্দেশ দিয়েছেন এবং যারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন, তাদের প্রত্যেককে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক আইনি লড়াই এবং অধিকার আদায়ের প্রতিটি পদক্ষেপে বর্তমান সরকার একটি নির্ভরতার প্রতীক ও শক্তিশালী স্তম্ভ হিসেবে তাদের পাশে থাকবে বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
বিশেষ ভাতা চালুর বিষয়ে মন্ত্রী আরও বিস্তারিত তথ্য প্রদান করে বলেন, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা বছরের পর বছর ধরে যে অবর্ণনীয় মানসিক যন্ত্রণা ও ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছেন, তা লাঘব করা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।
এই গভীর দায়িত্ববোধ থেকেই সরকারি উদ্যোগে তাদের জন্য একটি বিশেষ আর্থিক ভাতা চালুর পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এই মানবিক বিষয়টি যেন কোনোভাবেই আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার কবলে না পড়ে, সেজন্য চলতি জাতীয় বাজেটেই এই বিশেষ ভাতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে বলে তিনি সংলাপে উপস্থিত পরিবারগুলোকে আশ্বস্ত করেন।
এটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা রাষ্ট্রীয়ভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার পরিবারগুলোর প্রতি ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের একটি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি হিসেবে পরিগণিত হবে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দর্শনের সাথেও সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মানবাধিকার বিষয়ক এই তাৎপর্যপূর্ণ জাতীয় সংলাপে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের মাননীয় ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যে মানবাধিকার রক্ষা এবং বিচারহীনতার অন্ধকার সংস্কৃতি থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসার ওপর অত্যন্ত জোর দেন।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন, বাস্তবমুখী ও প্রেরণাদায়ী বার্তায় তিনি বলেন, এখন আর কেবলই শোক প্রকাশ, আক্ষেপ বা কান্নার সময় নয়; বরং এখন সময় এসেছে রাষ্ট্রের কাছে নিজেদের হারানো সাংবিধানিক অধিকার আদায় করার এবং প্রকৃত ন্যায়বিচার ছিনিয়ে আনার।
এই সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর করার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তিনি বাংলাদেশের জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে প্রশাসনিক ও আর্থিকভাবে আরও স্বাধীন এবং শক্তিশালী করার দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
এর পাশাপাশি, জাতীয় সংসদে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং হেফাজতে নির্যাতনের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করার জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনেরও জোরালো আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
সংলাপের একপর্যায়ে অনুষ্ঠানস্থলে এক অত্যন্ত আবেগঘন, নিস্তব্ধ এবং হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়। বিগত স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের আমলে বলপূর্বক গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা একে একে মঞ্চে এসে তাদের স্বজন হারানোর বেদনাময়, নিদারুণ ও মর্মান্তিক অভিজ্ঞতাগুলো উপস্থিত সকলের সামনে তুলে ধরেন।
বছরের পর বছর ধরে স্বামী, সন্তান বা পিতাকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় তাদের যে অন্তহীন প্রতীক্ষা এবং সীমাহীন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনা, সেই করুণ আর্তনাদ উপস্থিত সকলের চোখে পানি এনে দেয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা এই জাতীয় আয়োজনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের কাছে তাদের হারানো স্বজনদের প্রকৃত সন্ধান, সমাজে সম্মানজনক পুনর্বাসন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় ক্ষতিপূরণ এবং দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানান।
বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ ও আইনি বিচারের এই উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং মানবাধিকার সুরক্ষার ইতিহাসে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।