সোমবার, ২৯ জুন জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই সময়োপযোগী ঘোষণা দেন। দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন রূপরেখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বস্তির বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে সরকার এই বাজেট প্রণয়ন করেছে বলে তিনি তার বক্তব্যে জোরালোভাবে তুলে ধরেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দৃষ্টিতেও একটি দেশের বাজেট অধিবেশনে সরকারপ্রধানের এমন জনসম্পৃক্ত, ভারসাম্যপূর্ণ ও গঠনমূলক বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। সংসদে দেওয়া নিজের দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের চলমান গণতান্ত্রিক যাত্রার নানা দিক নিয়ে কথা বলেন।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি সংসদ অধিবেশন শুরু হওয়ার পর থেকে সরকার ও বিরোধী দল নানা রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পার করেছে। একটি প্রাণবন্ত ও সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেমনটা হওয়া উচিত, ঠিক তেমনই সংসদ সদস্যদের মধ্যে বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে কখনো ঐকমত্য আবার কখনো মতানৈক্য দেখা গেছে।
তবে সব ধরনের রাজনৈতিক বিতর্ক ও মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সরকার দেশের মানুষের সামনে একটি আশার আলো তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বিরোধীদলীয় নেতার গঠনমূলক সমালোচনার একটি বিশেষ মূল্য রয়েছে, কারণ সবাই যদি কেবল একমতই পোষণ করতেন, তবে আলোচনার কোনো প্রয়োজন হতো না।
বরং সংসদীয় গণতন্ত্রে পারস্পরিক মতামত বিনিময় এবং বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমেই একটি জাতি ধীরে ধীরে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হতে পারে। এই অভাবনীয় গণতান্ত্রিক অগ্রগতি ও দেশের বর্তমান স্থিতিশীল অবস্থার জন্য প্রধানমন্ত্রী কেবল সরকার বা রাজনৈতিক নেতাদের কৃতিত্ব দিতে নারাজ।
তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে উল্লেখ করেন যে, দেশের এই ঘুরে দাঁড়ানোর পেছনে যদি কাউকে সবচেয়ে বড় সম্মান ও কৃতিত্ব দিতে হয়, তবে তা প্রাপ্য এদেশের ২০ কোটি সাধারণ নাগরিকের। দেশের আপামর জনসাধারণের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা ও সীমাহীন ধৈর্য্যের কারণেই আজ সংসদীয় ব্যবস্থায় সব পক্ষ এক টেবিলে বসে সুন্দর ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট পথরেখা তৈরি করতে পারছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সাম্প্রতিক অতীতের সংকটময় সময়ের কথা গভীরভাবে স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ৫ আগস্টের আকস্মিক ঘটনার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি থেকে শুরু করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সার্বিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় ও নাজুক হয়ে পড়েছিল।
সেই চরম অনিশ্চয়তার অন্ধকার থেকে সফল উত্তরণ ঘটিয়ে পর্যায়ক্রমে দেশকে আজকের এই স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার অত্যন্ত সফলতার সাথে কাজ করেছে।
তিনি গভীর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে জাতীয় সংসদে রাজনৈতিক দলের সদস্য এবং স্বতন্ত্র সদস্য নির্বিশেষে সবাই অত্যন্ত সভ্য, শালীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে দেশের মানুষের বৃহত্তর স্বার্থ নিয়ে আলোচনা করছেন এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। এমন একটি চমৎকার সংসদীয় পরিবেশ বজায় রাখার জন্য তিনি সংসদে উপস্থিত সব সদস্যকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও সাধুবাদ জানান।
রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি পরিচালনায় ও দেশের সার্বিক উন্নয়নে বাজেটের অপরিসীম গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংসদের প্রতিটি মুহূর্ত জনগণের জন্য অত্যন্ত মূল্যবান। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ইতিমধ্যে সংসদে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তবে তিনি অতীতের ভালো-মন্দ বা পুরোনো রাজনৈতিক বিতর্ক নিয়ে আর সময় নষ্ট করতে চান না।
কারণ, দেশের সাধারণ জনগণ এখন পেছনের কথা শোনার চেয়ে ভবিষ্যতের সুস্পষ্ট রূপরেখা ও সম্ভাবনার কথা শুনতে বেশি আগ্রহী। এই প্রেক্ষাপটেই তিনি সরকারি দলের সদস্য হিসেবে এবং সরকারপ্রধানের জায়গা থেকে দাঁড়িয়ে এবারের বাস্তবমুখী বাজেটটিকে ‘জীবনবান্ধব বাজেট’ হিসেবে অভিহিত করেন।
একটি সুন্দর, স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত বাজেট উপস্থাপনের জন্য সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী অকপটে স্বীকার করেন যে, বৈশ্বিক ও দেশীয় বাস্তবতা অনেক কঠিন। তিনি বলেন, যত চমৎকার বাজেটই প্রণয়ন করা হোক না কেন, কোনো জাদুবলে সব জাতীয় সমস্যার রাতারাতি ও তাৎক্ষণিক সমাধান করা সম্ভব নয়।
তারপরও বর্তমান সরকার তার সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা, মেধা, বিবেক ও জ্ঞান প্রয়োগ করে এমন একটি সুষম বাজেট তৈরির আপ্রাণ চেষ্টা করেছে, যার ফলে সমাজের প্রতিটি শ্রেণি-পেশার মানুষ অন্তত কিছুটা হলেও স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারে এবং দেশের অর্থনীতি একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারে।
বাজেটের সবচেয়ে ইতিবাচক ও যুগান্তকারী দিক হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬১টি পণ্যের ওপর থেকে আরোপিত শুল্ক প্রত্যাহারের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, সরকারের এই জনবান্ধব সিদ্ধান্তকে সাধারণ জনগণ, বিশেষ করে দেশের নারীরা অত্যন্ত ইতিবাচক ও আনন্দঘনভাবে গ্রহণ করেছেন।
তিনি মহান স্রষ্টার প্রতি গভীর শুকরিয়া আদায় করে বলেন, শুল্ক প্রত্যাহারের এই সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপের কারণেই অতীতের মতো এবার বাজেট ঘোষণার আগে বা পরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা ঘটেনি।
এটি সরকারের একটি অন্যতম বড় সাফল্য। পরিশেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল এবং সরকার হিসেবে দেশের আপামর জনসাধারণের প্রতি তাদের যে পবিত্র দায়িত্ব রয়েছে, বর্তমান এই ‘জীবনবান্ধব বাজেট’-এর মাধ্যমে সরকার তার কিছুটা হলেও পালন করতে পেরেছে এবং সাধারণ মানুষকে অন্তত কিছুটা অর্থনৈতিক স্বস্তি এনে দিতে সক্ষম হয়েছে।