মঙ্গলবার, জুন ৩০, ২০২৬
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কর্মসংস্থানের জন্য তরুণদের দীর্ঘ অপেক্ষা ঘুচবে, সুস্পষ্ট রূপরেখা দিলেন প্রধানমন্ত্রী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬, ০৩:২০ পিএম

কর্মসংস্থানের জন্য তরুণদের দীর্ঘ অপেক্ষা ঘুচবে, সুস্পষ্ট রূপরেখা দিলেন প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধার এবং তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী ও সুনির্দিষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিগত সরকারের ভুল নীতি ও ব্যাপক অর্থ পাচারের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে টেনে তুলে একটি উৎপাদনশীল ও বিনিয়োগমুখী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তিনি।

 

সোমবার জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিনির্ধারণী বক্তব্য প্রদান করেন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে দেশের অর্থনীতিকে নতুন করে সাজানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

 

সংসদে দেওয়া দীর্ঘ ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দেশের সাম্প্রতিক অতীত ও বর্তমান অর্থনৈতিক দুর্দশার চিত্র অত্যন্ত খোলামেলাভাবে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিগত সময়ে স্বাস্থ্য খাতে চরম বিপর্যয়, ভ্রান্ত নীতিনির্ধারণ এবং হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের কারণে দেশের গোটা অর্থনৈতিক কাঠামো আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল।

 

এর ফলে দেশের সামগ্রিক উৎপাদন ও বিনিয়োগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল এবং বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় এক ভয়াবহ ও বিপজ্জনক পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছিল। এমনকি পুঁজিবাজারে নিজেদের সর্বস্ব হারিয়ে সাধারণ মানুষের আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনাও ঘটেছিল।

 

প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানান, বিগত সরকারের নেওয়া অপরিণামদর্শী ও অহেতুক বেশ কিছু অহংকার প্রদর্শনের প্রকল্পের কারণে দেশি-বিদেশি উৎস থেকে যে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়া হয়েছিল, তা বর্তমানে সমগ্র জাতির কাঁধে একটি বিশাল ও অন্যায্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

তবে এই চরম সংকটময় পরিস্থিতি নিয়ে কেবল হতাশা প্রকাশ না করে তা সাহসিকতার সঙ্গে মোকাবিলা করার কথা বলেন সরকারপ্রধান। বিরোধীদলীয় নেতার গঠনমূলক বক্তব্যের সঙ্গে পূর্ণ ঐকমত্য পোষণ করে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন, বর্তমান সরকার দেশের এই গভীর অর্থনৈতিক সংকটকে কোনোভাবেই অস্বীকার করতে চায় না।

 

একই সঙ্গে এই সংকটকে নিজেদের কোনো ব্যর্থতার অজুহাত হিসেবেও ব্যবহার করতে সরকার রাজি নয়। বরং দেশের আপামর জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে প্রবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সময়োপযোগী কার্যকর নীতির মাধ্যমে এই পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবিলা করা হবে।

 

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত একটি সম্পূর্ণ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের মানুষ বর্তমান সরকারকে যে পবিত্র দায়িত্ব অর্পণ করেছে, তা রক্ষায় তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বর্তমান সরকারের মূল রাষ্ট্রীয় দর্শন হলো ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ এবং ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।

 

সরকার গঠনের শুরু থেকেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সহজ করার বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন। বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকারের আপ্রাণ চেষ্টার কথা তিনি তুলে ধরেন।

 

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে যে বিশাল অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছিল, তা দেশের সাধারণ মানুষও গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এমন একটি চরম ভঙ্গুর ও বহুমুখী সংকটে জর্জরিত অর্থনীতির পটভূমিতেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করতে হয়েছে।

 

‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ শিরোনামে উপস্থাপিত এবারের বাজেটটি নিছক কোনো বার্ষিক আয়-ব্যয়ের খতিয়ান নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতিকে একটি মজবুত ও নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর এক সুদূরপ্রসারী রূপকল্প বলে তিনি অভিহিত করেন।

 

প্রধানমন্ত্রী সংসদে জানান, নয় লাখ আটত্রিশ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো দেশের অর্থনীতিকে মুষ্টিমেয় কিছু সুবিধাভোগীর একচেটিয়া কবল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে সেখানে সাধারণ মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

 

রাষ্ট্রীয় সম্পদের চরম সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, দেশে বিনিয়োগ ও উৎপাদনের চাকাকে আরও বেগবান করতে উন্নয়ন ব্যয় পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি করে তিন লাখ ষোলো হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

 

সরকারি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল প্রকল্পের পেছনে কত টাকা ব্যয় হলো, সেটি এখন আর বড় বিষয় নয়; বরং সেই প্রকল্প সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কী ভূমিকা রাখবে এবং ঠিক কত মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, সেটিকেই বর্তমান সরকার মূল বিবেচ্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছে।

 

অর্থনৈতিক এই সুদূরপ্রসারী কৌশল বাস্তবায়নে সরকারের সুনির্দিষ্ট তিনটি ধাপের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, প্রথম ধাপে নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালীকরণ এবং সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।

 

দ্বিতীয় ধাপে রাজস্ব ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার, রুগ্ন ব্যাংকিং খাতের পূর্ণাঙ্গ পুনর্গঠন এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হবে। সবশেষে চূড়ান্ত ধাপে একটি উৎপাদনশীল ও উদ্ভাবননির্ভর প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির ভিত সুদৃঢ় করা হবে।

 

প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, কেবল মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লেই একটি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন হয় না; প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সাধিত হয়, যখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বস্তি ফিরে আসে এবং তরুণ সমাজ তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত কাজ পায়।

 

ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, একটি পরনির্ভরশীল ও ঋণনির্ভর অর্থনীতির বদলে সম্পূর্ণ উৎপাদন ও বিনিয়োগনির্ভর এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে, যেখানে দেশের তরুণদের কাঙ্ক্ষিত চাকরির জন্য আর বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করতে হবে না।

 

বরং রাষ্ট্রে উপযুক্ত ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ পেয়ে তারা নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে। দেশীয় শিল্পের কাঙ্ক্ষিত বিকাশ, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ হয়ে থাকা রুগ্ন শিল্পকারখানাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং নতুন শিল্পাঞ্চলভিত্তিক ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অচিরেই একটি শক্তিশালী, রপ্তানিমুখী ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।