মঙ্গলবার, জুন ৩০, ২০২৬
১৫ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডেঙ্গু পরিস্থিতির আকস্মিক অবনতি, একদিনে আরও পাঁচজনের প্রাণহানি

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ জুন, ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম

ডেঙ্গু পরিস্থিতির আকস্মিক অবনতি, একদিনে আরও পাঁচজনের প্রাণহানি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ আবারও অত্যন্ত উদ্বেগজনক রূপ ধারণ করেছে। দেশজুড়ে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্রাণহানির সংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে।

 

সর্বশেষ প্রাপ্ত আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবে আরও পাঁচজন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই নতুন প্রাণহানির ঘটনার মধ্য দিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সর্বমোট সংখ্যা ১৮ জনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

আকস্মিক এই প্রাণহানির ঘটনা দেশের সাধারণ নাগরিক এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের জন্য একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও জরুরি সতর্কবার্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণের মানদণ্ডে বিচার করলে, জনবহুল এই দেশটিতে মশাবাহিত এই ভাইরাসের এমন বিস্তার নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত সংকট তৈরি করছে।

 

সোমবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক নিয়মিত এবং আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডেঙ্গু পরিস্থিতির এই সর্বশেষ ও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারি ওই তথ্য বিবরণী থেকে জানা যায়, সোমবার সকাল আটটা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যে পাঁচজন দুর্ভাগ্যবান ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে, তারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাসিন্দা ছিলেন।

 

ভৌগোলিক এই বিস্তৃতি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ডেঙ্গুর প্রকোপ এখন আর কেবল রাজধানীর সীমানার ভেতরেই আবদ্ধ নেই। নিহতদের মধ্যে দুজনই চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দা ছিলেন, যা ওই অঞ্চলের বর্তমান ডেঙ্গু পরিস্থিতির অবনতির একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।

 

অন্যদিকে, রাজধানী ঢাকার দুটি সিটি কর্পোরেশন এলাকা থেকেও প্রাণহানির বেদনাদায়ক খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন এলাকার একজন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকার একজন বাসিন্দা মৃত্যুবরণ করেছেন। এছাড়াও ময়মনসিংহ বিভাগের অপর একজন বাসিন্দা এই প্রাণঘাতী জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

 

প্রাণহানির পাশাপাশি ডেঙ্গুতে নতুন করে আক্রান্ত হওয়া এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যাও জনমনে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, উল্লেখিত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে আরও ১২৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

 

এই নতুন আক্রান্তের পরিসংখ্যান যুক্ত হওয়ার পর চলতি বছর এখন পর্যন্ত মশাবাহিত এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া সর্বমোট রোগীর সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯২৪ জনে। বিপুল সংখ্যক এই রোগীর হাসপাতালে ভর্তির ঘটনা দেশের সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।

 

তবে এই সংকটজনক পরিস্থিতির মাঝেও কিছুটা আশার কথা হলো, আক্রান্তদের মধ্যে একটি বিশাল অংশ ইতিমধ্যে যথাযথ চিকিৎসা গ্রহণ করে সুস্থ হয়ে নিজেদের বাড়িতে ফিরে যেতে সক্ষম হয়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় ১০০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন অবস্থা থেকে আরোগ্য লাভ করেছেন।

 

এ নিয়ে চলতি বছর এখন পর্যন্ত সর্বমোট ৫ হাজার ৪৫৫ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতাল থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। চলতি বছরের শুরু থেকে ডেঙ্গু পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বছরের প্রথম কয়েক মাসে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম থাকলেও হঠাৎ করেই তা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত জানুয়ারি মাসে সারা দেশে দুজনের মৃত্যু হয়েছিল। পরবর্তী ফেব্রুয়ারি মাসেও আরও দুজন ডেঙ্গু রোগীর প্রাণহানি ঘটে। এরপর মার্চ ও এপ্রিল মাসে ডেঙ্গুতে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া না গেলেও গত মে মাসে দুর্ভাগ্যজনকভাবে একজনের মৃত্যু হয়।

 

কিন্তু বর্তমান জুন মাসে এসে পরিস্থিতি আক্ষরিক অর্থেই চরম আকার ধারণ করেছে। কেবল এই জুন মাসেই এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, যা বিগত মাসগুলোর তুলনায় একটি বিশাল লাফ এবং দেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম শঙ্কার একটি অন্যতম প্রধান কারণ।

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসকরা মনে করছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব, অসময়ে এবং থেমে থেমে হওয়া বৃষ্টিপাত, এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে যত্রতত্র জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার প্রজনন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 

মূলত এই অনুকূল পরিবেশের কারণেই সারা দেশে ডেঙ্গুর এই আকস্মিক ও বিপজ্জনক বিস্তার ঘটছে বলে জোরালো ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোতে ডেঙ্গুর এই ধরনের প্রাদুর্ভাব নিয়ে বরাবরই চরম সতর্কতা জারি করে থাকে।

 

তাদের মতে, এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করার জন্য দেশব্যাপী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রান্তিক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা ছাড়া এই প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধের আর কোনো কার্যকর বিকল্প নেই।

 

বর্তমান এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তরফ থেকে ইতিমধ্যে সারা দেশের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হয়েছে। স্বাস্থ্য প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সকল স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষ ও পৌর প্রশাসনকে নিজ নিজ এলাকায় মশক নিধন কার্যক্রম অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ও জরুরি ভিত্তিতে জোরদার করার জন্য কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছে।

 

একই সাথে সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীদের নিরবচ্ছিন্ন ও সঠিক চিকিৎসা প্রদানের লক্ষ্যে পর্যাপ্ত স্যালাইন, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসা সামগ্রী সর্বদা প্রস্তুত রাখার জন্য বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 

ডেঙ্গু প্রতিরোধে কেবল সরকারি উদ্যোগই কখনোই যথেষ্ট নয়; বরং নাগরিক জীবনে ব্যক্তিগত সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিজেদের চারপাশের পরিবেশ সম্পূর্ণরূপে পরিচ্ছন্ন রাখার মাধ্যমেই এই ভয়ংকর জনস্বাস্থ্য সংকট থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব বলে চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বারবার তাগিদ দিচ্ছেন।