তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি এক কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ও যথাযথ মর্যাদায় এই স্মৃতি জাদুঘরটি খুলে দেওয়া না হয়, তবে দেশের আপামর জনসাধারণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেরাই এর ফটক উন্মোচন করে ভেতরে প্রবেশ করবে।
জনগণের আবেগের এই জায়গাতে কোনো ধরনের প্রশাসনিক গড়িমসি বরদাস্ত করা হবে না বলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন। বুধবার, ১ জুলাই রাজধানীর রায়েরবাজারে চব্বিশের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে শাহাদাতবরণকারী বীর শহীদদের গণকবর জিয়ারত ও শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যান এই তরুণ রাজনৈতিক নেতা।
সেখানে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত শেষে উপস্থিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের উদ্দেশে তিনি এসব কথা বলেন। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মুহূর্তে বিরোধী দলীয় এই শীর্ষ নেতার এমন বক্তব্য জনমনে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
অত্যন্ত আবেগঘন অথচ দৃঢ় কণ্ঠে নাহিদ ইসলাম চলমান বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে নানাবিধ প্রশ্ন উত্থাপন করেন। শহীদদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে তিনি বলেন, যাদের তাজা রক্তের বিনিময়ে দেশে একটি স্বৈরাচারী ব্যবস্থার পতন ঘটে নতুন রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে, তাদের স্মৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণে কোনো ধরনের কালক্ষেপণ বা অবহেলা স্বাধীনতাকামী জাতি কখনোই মেনে নেবে না।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার প্রক্রিয়ার বর্তমান ধীরগতি নিয়ে চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন নাহিদ ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, গণঅভ্যুত্থান চলাকালে দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত নির্মম হত্যাযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলোর তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম অত্যন্ত শম্বুকগতিতে অগ্রসর হচ্ছে।
এই বিলম্বিত বিচার প্রক্রিয়া শহীদ পরিবার এবং সাধারণ মানুষের মনে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বৃহত্তর স্বার্থে এই বিচার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ করার জোর তাগিদ দেন তিনি।
একইসঙ্গে তিনি সুনির্দিষ্টভাবে আলোচিত ওসমান হাদির হত্যাকারীদের অবিলম্বে বিদেশ থেকে দেশে ফিরিয়ে এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান। পাশাপাশি, ছাত্র-জনতার ওপর নজিরবিহীন দমন-পীড়ন ও গণহত্যার প্রধান নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে সর্বোচ্চ আইনি শাস্তি তথা ফাঁসির রায় কার্যকর করার বিষয়ে তার দলীয় ও ব্যক্তিগত অবিচল অবস্থানের কথা দৃঢ়ভাবে পুনর্ব্যক্ত করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির এই শীর্ষ নেতা।
গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা এবং আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বারোপ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকার যদি মনে করে যে কেবল নামকাওয়াস্তে বা দায়সারাভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিবাহী দিবসগুলো পালন করলেই তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে, তবে তা হবে জাতির সাথে এক চরম বেইমানি।
তিনি বর্তমান প্রশাসনকে স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ‘জুলাই সনদ’ এবং সাম্প্রতিক গণভোটের মাধ্যমে প্রতিফলিত জনগণের সুস্পষ্ট রায় অনতিবিলম্বে ও অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে, প্রশাসনে এবং সাংবিধানিক কাঠামোতে যে আমূল সংস্কারের রূপরেখা ছাত্র-জনতা দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
তিনি গভীর বিস্ময় ও হতাশা প্রকাশ করে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীর মতো একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সংবেদনশীল জাতীয় দিবস আসন্ন হলেও সরকার এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ঘোষণা করেনি।
শহীদদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন এবং গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে জাগ্রত রাখার স্বার্থে সরকারকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি অর্থবহ রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি ঘোষণার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি। চলমান রাজনৈতিক বিচারগুলোর রায় নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ।
বিশেষ করে, বিগত স্বৈরাচারী সরকারের প্রধান শরিক ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর সাম্প্রতিক আইনি সাজার প্রসঙ্গ টেনে তিনি তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ক্ষোভ ব্যক্ত করেন।
হাসানুল হক ইনুকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার অন্যতম প্রধান সহযোগী, নীতিনির্ধারক ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিশ্বস্ত দোসর হিসেবে আখ্যায়িত করে নাহিদ ইসলাম বলেন, বিগত সরকারের দীর্ঘ মেয়াদে সংঘটিত অসংখ্য মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, খুন ও বিরোধী মত দমনের দায় ইনু কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না।
এমন ভয়াবহ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রেক্ষাপটে একজন শীর্ষ নেতার মাত্র দশ বছরের কারাদণ্ড কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই লঘু রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষকে অবিলম্বে উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করার আহ্বান জানান তিনি।
আপিলের মাধ্যমে তার আরও কঠোর এবং দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার গভীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এই নেতা, যেন ভবিষ্যতে আর কোনো শাসক জনগণের ওপর এমন নিপীড়ন চালানোর সাহস না পায়।