স্বজন হারানো পরিবারগুলোর সদস্যরা জানান, দীর্ঘ সময় ধরে রাজপথে ন্যায়বিচারের দাবিতে সোচ্চার থাকলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি তারা দেখতে পাননি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে অসংখ্য পরিবার আজ মানবেতর জীবনযাপন করছে।
এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে এসব পরিবারকে পর্যাপ্ত রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় আনার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানানো হয়েছে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে ‘জুলাই চব্বিশ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি’ যৌথভাবে এই জাতীয় সম্মেলনের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী শত শত যোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা নিজেদের অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন। স্বজন হারানোর বেদনায় পুরো মিলনায়তনের পরিবেশ এ সময় ভারী হয়ে ওঠে।
মঞ্চের পটভূমিতে লেখা ছিল, ‘গর্বিত ইতিহাস, অদম্য চেতনা ৪ জুলাইয়ের এই দিনে হোক সবার অনুপ্রেরণা, যে আত্মত্যাগ ইতিহাসকে বদলে দিয়েছে।’ সম্মেলনে শহীদ মিরাজ হোসেনের পিতা আব্দুল রব মিয়া অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে জানান, জুলাই মাস এলেই তাদের হৃদয়ে শোকের মাতম শুরু হয়।
বিগত সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ৫ আগস্ট তার সন্তানের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে উল্লেখ করে তিনি এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার প্রার্থনা করেন। চট্টগ্রামের শহীদ ওয়াসিমের পিতা শফিউল আলম এবং শহীদ আবু সাঈদের ভাই আবু হোসেনও প্রায় অভিন্ন সুরে নিজেদের কষ্টের কথা জানান।
তারা বলেন, স্বৈরাচারের পতনের লক্ষ্যে যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন বা চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, তাদের অনেকের পরিবারই আজ দিশেহারা। তারা এসব পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশজুড়ে জুলাই যোদ্ধাদের স্মৃতি যথাযথভাবে সংরক্ষণের জোর দাবি জানান।
শহীদ আব্দুল্লাহ বিন জাহিদের মাতা ফাতেমাতুজ জোহরা তার পারিবারিক করুণ পরিণতির কথা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। বড় সন্তানকে হারানোর পর ছোট সন্তান ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে তিনি চরম অসহায়ত্বের শিকার হন।
তিনি জানান, সেই কঠিন সময়ে বর্তমান সরকারপ্রধান লন্ডন থেকে ব্যক্তিগতভাবে তাদের খোঁজ নিয়েছিলেন এবং সহায়তা প্রদান করেছিলেন। এখন তার একমাত্র চাওয়া, প্রতিটি হত্যার যেন ন্যায়বিচার হয়।
মিরপুরে ৪ আগস্ট নিহত শহীদ আলভীর পিতা আবুল হাসান বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিষ্ক্রিয়তার সমালোচনা করে বলেন, বিচারের আশায় তারা দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন করলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তনের পর তারা ন্যায়বিচারের বিষয়ে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।
আন্দোলনে গুরুতর আহত হয়ে দুই পা হারানো শাহীন মালু এবং গুলিবিদ্ধ মিল্লাত হোসেন তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন। মিল্লাত জানান, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর তিনি ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা পাননি এবং তার মৃত্যুর মিথ্যা খবরে তার পিতা শয্যাশায়ী হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
সুজন মোল্লা ও আলামিন নামক অপর দুই আহত যোদ্ধা জানান, উন্নত চিকিৎসার অভাবে তারা এখনো নিদারুণ শারীরিক ও মানসিক কষ্ট ভোগ করছেন। তারা অভিযোগ করেন, বিগত সময়ে তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের অজুহাতে চিকিৎসাসেবা ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল।
তারা বর্তমান প্রশাসনের কাছে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার এবং শহীদদের আত্মত্যাগকে কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার না করার কঠোর আহ্বান জানান। মেহেদী হাসান মিরাজ নামের এক যোদ্ধা আক্ষেপ করে বলেন, একটি রাজনৈতিক দল শহীদদের নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লুটলেও, আহতরা দিনের পর দিন কেবল অবহেলার শিকার হয়েছেন।
পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত এবং জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সকাল সোয়া দশটায় এই সম্মেলন শুরু হয়। অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনের ওপর নির্মিত একটি বিশেষ প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে ‘জুলাই স্মৃতি স্মারক’ তুলে দেন।
শহীদ মিরাজের পিতা, শহীদ সেলিমের ভাইসহ আহত যোদ্ধারা সরকারপ্রধানের হাত থেকে এই সম্মাননা গ্রহণ করেন। একইসঙ্গে শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রীকে একটি বিশেষ সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে এই আয়োজনে সরকারের একাধিক মন্ত্রী, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিশিষ্ট পেশাজীবী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।