রবিবার, জুলাই ৫, ২০২৬
২০ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ন্যায়বিচার দেশেই নিশ্চিত করা হবে, অবিচার নয়- প্রধানমন্ত্রী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ জুলাই, ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ন্যায়বিচার দেশেই নিশ্চিত করা হবে, অবিচার নয়- প্রধানমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। এই অভ্যুত্থানে যারা প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন, তাদের ন্যায়বিচার এই দেশের মাটিতেই নিশ্চিত করা হবে বলে সুদৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

 

তবে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে দিয়েছেন যে, বিচারের নামে কারও প্রতি যেন কোনো ধরনের অবিচার বা অন্যায় না হয়। বিচার প্রক্রিয়া কিছুটা বিলম্বিত হলেও প্রকৃত অপরাধীদের সঠিক বিচার নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।

 

শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত এক আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

 

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের অসামান্য আত্মত্যাগ এবং আহতদের অবদানকে চিরস্মরণীয় করে রাখার লক্ষ্যে সরকার গভীরভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন এবং যারা গুরুতর আহত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন ও পূর্ণাঙ্গ পুনর্বাসন করা রাষ্ট্রের এবং বর্তমান সরকারের একটি পবিত্র দায়িত্ব।

 

শহীদদের সর্বোচ্চ সম্মান ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের পাশাপাশি আহতদের উন্নত চিকিৎসাসেবা ও জীবনমান নিশ্চিত করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন।

 

বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং প্রয়াত ভাই আরাফাত রহমান কোকোর ওপর বিগত সরকারের আমলে হওয়া অমানবিক নির্যাতনের প্রসঙ্গ টেনে আনেন।

 

তিনি অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, অনুষ্ঠান চলাকালে তিনি বারবার ভাবছিলেন যে, তার মায়ের ওপর যে নির্মম অবিচার হয়েছে, তার প্রতিশোধ নেওয়ার বিষয়ে যদি তিনি তার মায়ের কাছে জানতে চাইতেন, তবে তার মা হয়তো বলতেন প্রতিশোধ না নিয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

 

তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, তার প্রয়াত ভাইকেও একই প্রশ্ন করা হলে তিনিও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে একই উত্তর দিতেন। জুলাইয়ের ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, যারা অকাতরে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন বা আহত হয়েছেন, তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের ইতিবাচক উন্নয়ন।

 

তাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গত ৫ আগস্ট দেশবাসী যে অভাবনীয় স্বাধীনতা ও অর্জন লাভ করেছে, তা একক কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। এটি দেশের প্রতিটি স্বাধীনতাকামী ও গণতন্ত্রকামী মানুষের অর্জন এবং আপামর জনতার সম্মিলিত ত্যাগের এক অনন্য ফসল।

 

তিনি উপস্থিত শহীদ পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, জাতিকে বিভক্ত করে কখনোই দেশকে প্রগতির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। যারা নিজেদের আপনজন হারিয়েছেন বা অঙ্গহানির শিকার হয়েছেন, তাদের এই ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়।

 

তবে সবাই মিলে একটি সমৃদ্ধ দেশ গড়তে পারলে একদিন তারা গর্ব করে বলতে পারবেন যে, তাদের আপনজনের পবিত্র রক্তের বিনিময়েই আজ দেশের মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটেছে। শনিবার সকাল সোয়া ১০টায় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে এই জাতীয় সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।

 

এরপর শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি হৃদয়স্পর্শী প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

 

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ শীর্ষক মূলমন্ত্রকে ধারণ করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ‘জুলাই চব্বিশ শহীদ পরিবার সোসাইটি’ এবং ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি’র আমন্ত্রণে শত শত শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্য অংশ নেন।

 

তারা প্রধানমন্ত্রীর সামনে নিজেদের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ও বেদনার কথা তুলে ধরেন। স্বজন হারানো মানুষের আর্তনাদ শুনে এ সময় খোদ প্রধানমন্ত্রীর চোখেও জল চলে আসে। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে সম্মানসূচক ‘জুলাই স্মৃতি স্মারক’ তুলে দেন।

 

শহীদ মিরাজের বাবা, শহীদ সেলিমের ভাই, আহত আল মিরাজ এবং আমিনুল ইসলাম ইমন প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে সরাসরি এই স্মারক গ্রহণ করেন। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, অনুষ্ঠানে উপস্থিত বাকি সবার কাছেও পর্যায়ক্রমে এই স্মৃতি স্মারক সযত্নে পৌঁছে দেওয়া হবে।

 

পরবর্তীতে উপস্থিত শহীদ পরিবারের পক্ষ থেকেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে একটি বিশেষ স্মৃতি স্মারক তুলে দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়। জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই জাতীয় সম্মেলনে সরকারের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

 

তাদের মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ণ মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান এবং প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন উল্লেখযোগ্য। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতা এবং আয়োজক সংগঠনের নেতারা বক্তব্য প্রদান করেন।

 

অনুষ্ঠানে শহীদ আবু সাঈদ, শহীদ শাহরিয়ার হোসেন আলভী, শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদ, শহীদ ওয়াসিম আকরাম এবং শহীদ মিরাজ হোসেনের পরিবারের সদস্যরা আবেগজড়িত কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করেন।

 

সেই সঙ্গে আহত শাহিন মালু, সুজন মোল্লা, মিল্লাত হোসেন, আল-আমীন ও মেহেদি হাসান মিরাজ তাদের বর্তমান সংগ্রামের কথা তুলে ধরেন। দেশি-বিদেশি রাজনীতিক, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার এবং সামরিক-বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সম্মেলনটি এক আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে।