সরকারের পর্যায়ক্রমিক সব কল্যাণমুখী নাগরিক সুবিধাকে একটি মাত্র একক কার্ডের আওতায় নিয়ে আসার এই মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বুধবার জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন এবং প্রথম বাজেটের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এই গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণেও সামাজিক সুরক্ষায় রাষ্ট্রের এমন সমন্বিত উদ্যোগকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড, প্রবাসী কার্ড কিংবা ধর্মীয় গুরুদের জন্য বরাদ্দকৃত বিশেষ সুযোগ-সুবিধাগুলো জনগণের প্রতি রাষ্ট্রের কোনো করুণা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের পরম দায়িত্ব।
রাষ্ট্র যদি তার নাগরিকদের এই নূন্যতম দায় মেটাতে ব্যর্থ হয়, তবে শেষ পর্যন্ত জনগণ এবং রাষ্ট্র উভয়ই দুর্বল হয়ে পড়ে। এই দায়িত্ববোধ থেকেই ভবিষ্যতে আলাদা কার্ডের পরিবর্তে একটি সমন্বিত ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করা হবে, যার মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিক একটি একক পরিচয়ের অধীনে রাষ্ট্রের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা অত্যন্ত সহজে লাভ করতে পারবেন।
বক্তব্যের একটি বড় অংশজুড়ে প্রধানমন্ত্রী দেশের কৃষি খাত এবং প্রান্তিক কৃষকদের অধিকারের কথা বিশদভাবে তুলে ধরেন। নিজেকে একজন কৃষকের সন্তান হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, এ দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এই উপলব্ধির জায়গা থেকেই বর্তমান সরকার তাদের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকেই দেশের প্রায় ১৩ লাখ প্রান্তিক কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বকেয়া কৃষিঋণ সুদসহ সম্পূর্ণ মওকুফ করে দিয়েছে। এটি কোনো কাগুজে প্রতিশ্রুতি নয়, বরং মাঠপর্যায়ে কৃষকরা এরই মধ্যে এর সুফল ভোগ করতে শুরু করেছেন বলে তিনি সংসদকে অবহিত করেন।
দেশের প্রান্তিক মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে সরকারি ও বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। ফ্যামিলি কার্ডের মতো জনকল্যাণমুখী সামাজিক নীতিকে সমর্থন জানানোর জন্য তিনি বিরোধীদলীয় নেতাসহ সকল সংসদ সদস্যকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি এবং বিদেশি আধিপত্য রুখতে হলে রাষ্ট্র ও জনগণকে রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। বিগত স্বৈরাচারী আমলে প্রতি বছর গড়ে ১৬ বিলিয়ন ডলার অর্থ পাচারের কঠোর সমালোচনা করে তিনি জানান, দুর্নীতিমুক্ত, টেকসই ও বিনিয়োগনির্ভর অর্থনীতি গড়তে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর।
২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার যে দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তার মূল চালিকাশক্তি হলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
কর্মসংস্থান এবং পরিবেশ সুরক্ষায় সরকারের দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখাও অধিবেশনে তুলে ধরা হয়। দেশের বিশাল জনশক্তিকে সম্পদে পরিণত করতে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১০ লাখ, সুনীল অর্থনীতি ও প্রতিবেশ-বান্ধব পর্যটন খাতে আরও ১০ লাখসহ পর্যায়ক্রমে ৯ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের এক সুবিশাল মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশে ১০ হাজার নতুন নার্সারি উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং আড়াই লাখ তরুণের সবুজ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সবশেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের মানুষের মুক্তির সনদ হিসেবে যে ৩১ দফা রূপরেখা জাতির সামনে উপস্থাপন করা হয়েছিল, তা আজ সমগ্র বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে স্বাক্ষরিত ‘জুলাই সনদ’-এর প্রতিটি দফা বাস্তবায়নে সরকার পুরোপুরি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সম্পূর্ণ পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১০ হাজার নতুন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শহীদদের রক্তঋণ শোধ করে একটি বৈষম্যহীন, উগ্রবাদমুক্ত এবং প্রকৃত গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠা করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।