মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬, ০১:০৭ পিএম

শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ২০১৩ সালের রাজধানীর মতিঝিল শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ওপর পরিচালিত আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিতর্কিত অভিযান এবং তৎপরবর্তী সহিংসতাকে কেন্দ্র করে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে চার্জ বা অভিযোগ গঠন করা হয়েছে।

 

ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের শীর্ষ নেতৃত্ব, সামরিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ মোট ৪১ জনের বিরুদ্ধে এই আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।

 

অভিযুক্তদের তালিকায় শীর্ষ ব্যক্তি হিসেবে উঠে এসেছে ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নাম, যা দেশটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও বিচারিক ইতিহাসে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা গেছে যে, বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-২ প্যানেলে এই চাঞ্চল্যকর মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। অভিযোগ জমা দেওয়ার ঐতিহাসিক মুহূর্তে আদালতে উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন, মঈনুল করিম এবং মার্জিনা রায়হান।

 

প্রসিকিউশন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, অত্যন্ত সতর্কতা ও পেশাদারিত্বের সাথে দীর্ঘ তদন্ত কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা তাঁদের বিস্তারিত প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে পেশ করেন। সেখান থেকে সার্বিক তথ্য-প্রমাণ ও আইনগত দিকসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই-বাছাই শেষে এই ফরমাল চার্জ আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়।

 

প্রসিকিউশন কর্তৃক উপস্থাপিত আসামিদের তালিকায় প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাশাপাশি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বহু শীর্ষ নীতি নির্ধারক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের নাম যুক্ত রয়েছে।

 

এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু, সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক যথাক্রমে মাহবুবউল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও জাহাঙ্গীর কবির নানক।

 

এছাড়া সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, সাবেক তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, যুবলীগের প্রাক্তন চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী এবং সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদের নামও আসামির তালিকায় স্থান পেয়েছে।

 

আসামির এই দীর্ঘ তালিকায় কেবল মূলধারার রাজনীতিকরাই নন, বরং সে সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা সামরিক ও বেসামরিক বাহিনীগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

 

সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, ন্যাশনাল টেলিকম মনিটরিং কেন্দ্রের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান এবং র‍্যাবের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) ও পরবর্তীতে সেনাসদরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমানের মতো উচ্চপদস্থ সামরিক ব্যক্তিরা এই তালিকায় রয়েছেন।

 

পাশাপাশি পুলিশের সাবেক চারজন মহাপরিদর্শক-হাসান মাহমুদ খন্দকার, এ কে এম শহীদুল হক, ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী এবং সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার ও অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

 

তালিকায় অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যেমন সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম এবং সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মাহবুব হোসেনের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

 

এছাড়া বেসামরিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের পরিচিত মুখ ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মোজাম্মেল হক বাবু ও ফারজানা রূপাকেও এই মামলায় আসামি করা হয়েছে।

 

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে মধ্যরাতে এক নজিরবিহীন সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে তৎকালীন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

 

সেই রাতে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী ঘটনার সঠিক তথ্য ও নিহতের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে গভীর বিতর্ক বজায় ছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে যে, ওই সমাবেশ ও সংঘাতময় পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ দেশের চারটি পৃথক স্থানে মোট ৫৮ জন নাগরিক নিহত হন।

 

এর মধ্যে কেবল রাজধানী ঢাকাতেই প্রাণ হারান ৩২ জন, শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জে নিহত হন ২০ জন, বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ৫ জন এবং কুমিল্লা জেলায় ১ জন ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করা গেছে।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও দেশি-বিদেশি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকগণ দীর্ঘ দিন ধরে এই মর্মান্তিক ঘটনার একটি স্বচ্ছ, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ বিচারিক অনুসন্ধানের দাবি জানিয়ে আসছিলেন।

 

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাখিলকৃত এই অভিযোগপত্রের মধ্য দিয়ে অবশেষে ২০১৩ সালের সেই বিতর্কিত পদক্ষেপের আইনগত দায়বদ্ধতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে এই বিচারপ্রক্রিয়া কতটুকু বস্তুনিষ্ঠভাবে সামনে এগোয়, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষায় রয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়।