ছয়জন নিষ্পাপ নবজাতকের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রায় দেড় মাস আগে হাসপাতালটির চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার সার্বিক অনুমোদন বাতিল করেছিল সরকার। তবে দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং তদন্ত শেষে সোমবার হাসপাতালটিকে পুনরায় তাদের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম শুরু করার অনুমতি প্রদান করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মানদণ্ড অনুযায়ী যেকোনো চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ধরনের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল, আর তাই সরকার এক্ষেত্রে বেশ কিছু কঠোর শর্ত জুড়ে দিয়েছে।
সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জারি করা এক সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে লাইসেন্স পুনর্বহালের এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, পূর্বের নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে হাসপাতালটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলেও, ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের চিকিৎসাজনিত অবহেলা রোধে তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় থাকতে হবে।
জনগণের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের এই দ্বৈত অবস্থান-একদিকে সেবাদানের সুযোগ প্রদান এবং অন্যদিকে কঠোর নিয়মাবলির প্রয়োগ-একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
প্রজ্ঞাপন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র থেকে জানা যায়, ছয় নবজাতকের মৃত্যুর মতো একটি অত্যন্ত বেদনদায়ক ঘটনার পরপরই জনস্বার্থ ও চিকিৎসাবিধির কথা বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল।
সরকারের সেই নির্দেশনার পর নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে এবং পুনরায় কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পেতে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে নিয়ম মেনে একটি আনুষ্ঠানিক আপিল দায়ের করা হয়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ওই আপিল আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এবং প্রকৃত ঘটনা অনুসন্ধানের লক্ষ্যে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে।
গত ১৫ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ওই তদন্ত কমিটিকে মাত্র তিন কর্মদিবসের মধ্যে সরেজমিন হাসপাতাল পরিদর্শন করে একটি বিস্তারিত ও বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট তদন্ত কমিটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি সরেজমিন পরিদর্শন করে এবং তাদের সার্বিক অবকাঠামো, চিকিৎসাসেবার মান ও ব্যবস্থাপনা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। পরবর্তীতে তারা মন্ত্রণালয়ে যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে, তা সরকারের নীতিনির্ধারক ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কাছে সন্তোষজনক বলে বিবেচিত হয়।
মূলত তদন্ত কমিটির সেই ইতিবাচক ও সুপারিশমূলক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই সরকার হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের পূর্ববর্তী আদেশটি প্রত্যাহার করার যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর ফলে হাসপাতালটির জন্য পুনরায় চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনার আইনগত পথ সুগম হয়।
তবে, লাইসেন্স পুনর্বহালের এই অনুমতি কোনোভাবেই নিঃশর্ত নয়। প্রজ্ঞাপনে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, পুনরায় চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম শুরু করতে হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট ও কঠোর শর্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মেনে চলতে হবে।
এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য শর্তটি হলো, দেশের চিকিৎসাসেবা খাতের অন্যতম প্রধান আইন ‘দ্য মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’-এর প্রতিটি বিধান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করতে হবে।
এই আইনের আওতায় রোগীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি আইনিভাবে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এছাড়া, লাইসেন্স নবায়নের শর্তাবলির অংশ হিসেবে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে তাদের চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নে তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ গ্রহণেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ করে হাসপাতালে রোগীর অনুপাতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডিউটি চিকিৎসক এবং নিবন্ধিত ও প্রশিক্ষিত নার্স নিয়োগের প্রক্রিয়াটি দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে, যাতে জনবলের অভাবে কোনো রোগীকে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত বা অবহেলার শিকার হতে না হয়।
প্রজ্ঞাপনের শেষাংশে সরকারের পক্ষ থেকে একটি অত্যন্ত কঠোর ও সুস্পষ্ট সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলা হয়েছে যে, ভবিষ্যতে যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাইসেন্সে উল্লেখিত কোনো শর্ত সামান্যতম লঙ্ঘন করে বা চিকিৎসা ব্যবস্থায় কোনো ধরনের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে সরকার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে পুনরায় চরম আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পিছপা হবে না।