এই গুরুতর আর্থিক কেলেঙ্কারির মামলায় সদ্য দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করা সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অন্যতম আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আলোচিত এই মামলায় তিনি ছাড়াও দেশের প্রভাবশালী ব্যবসায়ীসহ আরও ১৯ জনকে আসামি করা হয়েছে, যা দেশের আর্থিক খাত ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দৃষ্টিতেও শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অভিযোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মামলার প্রেক্ষাপট ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা যায় যে, গত ২০২৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ইসলামী ব্যাংকের প্রধান শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মো. আবদুচ ছামাদ বাদী হয়ে এই মামলাটি দায়ের করেন।
তিনি ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক মো. সাব্বির ফয়েজের আদালতে এই মামলার আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দেন। আদালত অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করেন এবং সার্বিক অভিযোগ আমলে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনকে পুরো বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন।
সোমবার মামলার বাদী মো. আবদুচ ছামাদ সংবাদমাধ্যমের কাছে মামলা দায়েরের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করেছেন। বর্তমানে এই স্পর্শকাতর মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিচারিক আদালতের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, সর্বশেষ গত ২৩ জুন মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন ধার্য করা ছিল।
তবে তদন্তকারী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন ওই নির্দিষ্ট দিনে তাদের অনুসন্ধান প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। এই বিলম্বের কারণে ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ আদালতের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত বিচারক মো. আলমগীর আগামী ১১ আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রিয়াজ হোসেন নিশ্চিত করেছেন।
এই মামলার আসামিদের তালিকায় দেশের আর্থিক খাতের বেশ কয়েকজন পরিচিত ও প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম রয়েছে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল ওয়াহেদ, একই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মিরফাত আরা বেগম এবং এস আলম শিল্পগোষ্ঠীর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলম ওরফে এস আলম।
এছাড়া ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির বেশ কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান পরিচালক এবং পদস্থ কর্মকর্তাকেও আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন মো. জয়নাল আবেদিন, আরাস্তু খান, অধ্যাপক মো. নাজমুল হাসান, আবু সাইদ মোহাম্মদ কাশেম, সাইফুল ইসলাম, মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, সৈয়দ আবু আসাদ, মো. কামরুল হোসেন, আহসান আলম, অধ্যাপক ডা. মো. সেলিম উদ্দিন, শওকত হোসেন, খুরশিদ-উল-আলম, অধ্যাপক ডা. কাজী শহীদুল আলম, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মতিন, জামাল মোস্তফা চৌধুরী এবং অধ্যাপক ডা. মো. সিরাজুল করিম।
মামলার এজাহারে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির একজন পরিচালক হিসেবে। এই মামলায় তাকে ১২ নম্বর আসামি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
অভিযোগে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এস আলম এবং আবদুল ওয়াহেদের প্রত্যক্ষ যোগসাজশে তিনি ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং এই আর্থিক অনিয়মের সাথে তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
প্রাথমিকভাবে ১২ নম্বর আসামি হিসেবে উল্লিখিত মো. শাহাবুদ্দিনই সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি কি না, তা নিয়ে আদালত প্রাঙ্গণে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছুটা ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি আদালতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং আইনজীবীরাও তাৎক্ষণিকভাবে তার পরিচয়ের বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করে বলতে পারেননি।
মামলার বাদী পক্ষের নির্ধারিত আইনজীবী আব্দুল কুদ্দুসের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি পেশাদারিত্বের সাথে জানান যে, এজাহারে উল্লিখিত ১২ নম্বর আসামি সাবেক রাষ্ট্রপতি কি না, তা তার ব্যক্তিগতভাবে জানা নেই।
তিনি কেবল ব্যাংকের আইনি প্রতিনিধি হিসেবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সরবরাহ করা তালিকা অনুযায়ী মামলাটি দায়ের করেছেন। তবে পরবর্তীতে মামলার বাদী আবদুচ ছামাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি পরিচয়টি স্পষ্ট করেন। তিনি জানান, ঘটনার সময়কালে উল্লিখিত ব্যক্তি ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন, তাই পারিপার্শ্বিক তথ্য বিবেচনায় তিনিই সদ্য পদত্যাগী রাষ্ট্রপতি।
আর্থিক অনিয়মের ধরন ও মাত্রা সম্পর্কে মামলার অভিযোগে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, আসামিদের দ্বারা পরিচালিত ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেড অভিযোগকারী প্রতিষ্ঠানের মোট ৭ কোটি ৭৫ লাখ ৩৬ হাজার ৩৯৩টি শেয়ার অধিগ্রহণ করে, যা ব্যাংকটির মোট শেয়ারের ৪ দশমিক ৮১৬০ শতাংশ।
এই বিপুল পরিমাণ শেয়ারের আর্থিক মূল্য প্রায় ২৫১ কোটি টাকা। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, অধিগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান ব্রিলিয়ান্ট বিজনেস কোম্পানি লিমিটেডের অনুমোদিত মূলধন ৫০ কোটি টাকা হলেও তাদের পরিশোধিত মূলধন ছিল মাত্র আট লাখ টাকা।
মাত্র আট লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের একটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ২৫১ কোটি টাকার শেয়ার কিনে নেওয়া কোনোভাবেই তাদের স্বাভাবিক আর্থিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে যে, অভিযুক্তরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং অভিন্ন অসৎ উদ্দেশ্যে জনগণের আমানতের অর্থে এই নজিরবিহীন দুর্নীতির আশ্রয় নিয়েছেন।
অভিযোগে আরও ভয়াবহ একটি চিত্র তুলে ধরে বলা হয় যে, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির মোট শেয়ারের প্রায় ৮১ দশমিক ৯২ শতাংশ অধিগ্রহণ করেছে ২৪টি অংশীদারত্বভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, এই প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশিরভাগই সরাসরি এস আলম শিল্পগোষ্ঠীর সাথে সম্পৃক্ত।
শেয়ার হস্তান্তরের এই জটিল প্রক্রিয়া, বিপুল পরিমাণ অর্থের অজানা উৎস এবং ক্রয়-বিক্রয়ের সময়কাল গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায় যে, শেয়ার বেচাকেনার কাজ উভয় পক্ষের ক্ষেত্রেই একই দিনে সম্পন্ন হয়েছে।
এর মাধ্যমে এটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, পুরো শেয়ার হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি পূর্বপরিকল্পিত এবং একটি সুনির্দিষ্ট ও অবৈধ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এস আলম শিল্পগোষ্ঠী, এর শীর্ষ পর্যায়ের মালিকপক্ষ, সংশ্লিষ্ট ২৪টি নামসর্বস্ব কোম্পানি এবং তাদের দ্বারা নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালকেরা সম্মিলিতভাবে একটি দেশের অন্যতম বৃহৎ ব্যাংকের ওপর নিজেদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য এই হীন কৌশল অবলম্বন করেছেন।
এই অপকর্মের সমুদয় দায়ভার সম্মিলিতভাবে তাদের ওপরই বর্তায়। ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, স্বার্থসংশ্লিষ্ট অবৈধ লেনদেন এবং ভুয়া বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
অবৈধভাবে নিজেদের পকেট ভারী করে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের তছরুপের মাধ্যমে তারা যে ফৌজদারি বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন, তা আইনি ভাষায় গুরুতর অপরাধ। উল্লেখ্য, এই চাঞ্চল্যকর মামলা দায়েরের পর আদালত মো. সাহাবুদ্দিন ব্যতীত অন্য সকল আসামির দেশত্যাগের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন, যাতে সুষ্ঠু আইনি প্রক্রিয়া কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়।