শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬
৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জানুয়ারিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরিকল্পনা নির্বাচন কমিশনের

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম

জানুয়ারিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের পরিকল্পনা নির্বাচন কমিশনের
ছবি: সংগৃহীত

দেশের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন, গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক ও জাতীয় পাবলিক পরীক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামগ্রিক স্থিতিশীলতা অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রাথমিক রূপরেখায় কৌশলগত পরিবর্তন এনেছে নির্বাচন কমিশন।

 

চলতি বছরের নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে স্থানীয় সরকারের কোনো স্তরের নির্বাচন আয়োজন না করে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে এই কার্যক্রম শুরু করার নীতিগত চিন্তাভাবনা করছে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি।

 

বিশেষ করে বছরের শেষ প্রান্তে শিক্ষাঙ্গনে চলমান পরীক্ষার ব্যস্ততা এবং ভোটকেন্দ্র হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবহারের জটিলতা এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা এবং সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করাই বর্তমানে তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।

 

বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার নির্বাচন কমিশনের এই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় জানান, বছরের শেষ দুই মাস সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিভিন্ন শ্রেণির বার্ষিক মূল্যায়ন পরীক্ষা এবং কেন্দ্রীয় পাবলিক পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই সময়ে নির্বাচন আয়োজনের মতো একটি বৃহৎ ও কর্মযজ্ঞপূর্ণ প্রশাসনিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে তা সরাসরি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও স্বাভাবিক পড়াশোনার পরিবেশ বিঘ্নিত করতে পারে।

 

সেই বাস্তবতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কমিশন নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে কোনো প্রকার ভোটগ্রহণ থেকে বিরত থাকার পক্ষপাতী। পরীক্ষাগুলো সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হওয়ার পর আগামী বছরের জানুয়ারি মাসেই সম্ভাব্য সব স্থানীয় নির্বাচন পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হচ্ছে।

 

নির্বাচন আয়োজনের প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনার উল্লেখ করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক পত্র আদান-প্রদান বা চিঠি চালাচালির সাধারণ কোনো নিয়ম বা পূর্ববর্তী নজির নেই।

 

তবে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচন কমিশন যেকোনো সময় ভোটগ্রহণের জন্য নিজেদের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পূর্ণ বজায় রেখেছে। ইতিমধ্যে কমিশন সরকারের সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার বিভাগের কাছে একটি বিশদ ও সুনির্দিষ্ট তথ্য তালিকা চেয়েছে, যাতে দেশের কোন কোন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান বা ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা বর্তমানে আইনি ও প্রশাসনিকভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্পূর্ণ উপযোগী রয়েছে, তা সঠিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়।

 

সরকারের পক্ষ থেকে সেই তালিকা হস্তান্তরিত হলেই কমিশন প্রতিটি অঞ্চলের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পথে অগ্রসর হবে। নির্বাচনী কার্যক্রম পিছিয়ে আগামী বছরের শুরুতে নির্ধারণ করার পেছনে বিদ্যমান বাস্তবসম্মত কারণগুলো তুলে ধরে আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য ব্যাপক মাত্রায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন নিশ্চিত করতে হয়।

 

অপরদিকে জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষাগুলো চলাকালেও প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, পরীক্ষা কেন্দ্রের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব পালনে পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের সার্বক্ষণিক ব্যস্ত থাকতে হয়।

 

একই সময়ে যদি নির্বাচনী দায়িত্ব ও পরীক্ষার নিরাপত্তা-উভয় ক্ষেত্রেই বাহিনীকে নিয়োজিত করতে হয়, তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুচারুভাবে নিয়ন্ত্রণ করা প্রশাসনের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

এছাড়া দেশের সিংহভাগ ভোটকেন্দ্রই মূলত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্থাপন করা হয়ে থাকে। ফলে পরীক্ষা চলাকালে সেসব কেন্দ্র নির্বাচনী কাজে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অসম্ভব। শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের স্বার্থরক্ষা এবং নির্বাচনের সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যৌথ তাগিদ থেকেই এই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

 

বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় তৃণমূল পর্যায়ের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের মতো স্থানীয় প্রশাসনিক কাঠামো সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন নাগরিক সেবা এবং উন্নয়নের সাথে সরাসরি জড়িত।

 

ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে যথাশীঘ্র সম্ভব জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নতুন প্রতিনিধি নির্বাচন করা একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল সাংবিধানিক দায়িত্ব। নির্বাচন বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচন পেছানোর এই কৌশলগত সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন শিক্ষাব্যবস্থাকে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশাসনিক চাপ থেকে মুক্ত রাখবে, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনকেও মাঠপর্যায়ের নির্বাচনী প্রস্তুতি ও ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ আরও নিপুণভাবে সম্পন্ন করার পর্যাপ্ত সময় এনে দেবে।

 

যেকোনো জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচনের মূল চালিকাশক্তি হলো ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, জানুয়ারি মাসে দেশের আবহাওয়া সাধারণত অনুকূল থাকে এবং শিক্ষাবর্ষের সূচনালগ্নে স্কুল-কলেজগুলোতে কোনো পরীক্ষার চাপ থাকে না।

 

ফলে সেই সময় স্থানীয় সরকারের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে সাধারণ ভোটাররা উৎসবমুখর পরিবেশে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা প্রদান করতে সক্ষম হবে।

 

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে এবং বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্বাচন কমিশন তাদের প্রাথমিক পরিকল্পনাকে নতুন করে সাজিয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট সব মহলের কাছে একটি দায়িত্বশীল ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।