বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৫, ২০২৬
২৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নিরাপদ অভিবাসন ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম

নিরাপদ অভিবাসন ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান রাষ্ট্রপতির
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করা এবং বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে আনা ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গভীর গুরুত্বারোপ করেছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

 

একই সঙ্গে মানবপাচার ও প্রতারণামূলক দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণেরও জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে যারা নিরলস অবদান রেখে চলেছেন, সেই প্রবাসী কর্মীদের অধিকার এবং জীবনের নিরাপত্তা কোনোভাবেই অনিশ্চিত বা হুমকিস্বরূপ থাকতে পারে না।

 

বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে রাজধানীর বিখ্যাত হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুমে আয়োজিত এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

 

রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট বা আরএমএমআরইউ-এর গৌরবোজ্জ্বল ৩০ বছর পূর্তি উদযাপন এবং 'সোনার মানুষ সম্মিলন ২০২৬'-এর পুরস্কার প্রদান ও সমাপনী উপলক্ষে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

 

রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে অভিবাসী কর্মীদের জীবনসংগ্রামের কঠিন বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় বিদেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে দেশের অসংখ্য সাধারণ কর্মী নিজেদের শেষ সম্বল কৃষিজমি বিক্রি করতে বাধ্য হন, চড়া সুদে ঋণ গ্রহণ করেন এবং পরিবারের দীর্ঘদিনের তিল তিল করে জমানো সঞ্চয় নিঃশেষ করে ফেলেন।

 

এত বিপুল আত্মত্যাগের পরও তাদের একটি বড় অংশ বিদেশে গিয়ে চরম অর্থ প্রতারণার শিকার হন। অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের ঘানি টানতে গিয়ে তারা যেমন সর্বস্বান্ত হন, তেমনি গন্তব্য দেশে পৌঁছানোর পর অনিশ্চিত চাকরি, অমানবিক কর্মপরিবেশ কিংবা পূর্বনির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী ন্যায্য বেতন না পাওয়ার মতো ভয়াবহ ও জটিল সমস্যার আবর্তে নিপতিত হন।

 

এই অমানবিক পরিস্থিতি থেকে দেশের নাগরিকদের মুক্তি দিতে এবং এসব বহুমাত্রিক সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সব পক্ষকে অত্যন্ত সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেন রাষ্ট্রপতি।

 

প্রবাসী কর্মীদের আইনি সুরক্ষা ও মানবিক অধিকার নিশ্চিতে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর ভূমিকার কঠোর মূল্যায়ন করেন রাষ্ট্রপ্রধান। তিনি মিশনগুলোকে প্রবাসীদের প্রতি আরও বেশি দায়িত্বশীল, সক্রিয় এবং আন্তরিকভাবে শ্রমিকবান্ধব হওয়ার নির্দেশ প্রদান করেন।

 

তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, প্রতিটি কর্মী মাতৃভূমি ত্যাগ করে বিদেশযাত্রার আগে যেন তাঁর চাকরির চুক্তিনামা, প্রাপ্য বেতন-ভাতা, কর্মস্থলের প্রকৃত পরিবেশ এবং স্বীয় আইনি অধিকার সম্পর্কে একটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করতে পারেন, রাষ্ট্রযন্ত্রকে অবশ্যই সেই কাঠামোগত ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে হবে।

 

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার ক্ষেত্রে প্রবাসীদের অসামান্য অবদানের কথা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধানতম দুটি ভিত্তি বা চালিকাশক্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো কষ্টার্জিত আয় এবং দেশের তৈরি পোশাকশিল্প। প্রবাসীদের পাঠানো এই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা একদিকে যেমন দেশের অর্থনীতির তারল্য ও বৈদেশিক মুদ্রার নিরবচ্ছিন্ন জোগান নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় পরিশোধ এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামষ্টিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এক অনস্বীকার্য ও যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে চলেছে।

 

তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে ৩৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সমপরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছেন। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ কেবল দেশের লাখ লাখ প্রান্তিক পরিবারের জীবনযাত্রার মানকেই উন্নত করছে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিকে এক মজবুত ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে।

 

রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে উঠে আসে দেশের প্রায় এক কোটি পঞ্চাশ লাখ প্রবাসী কর্মীর অবিস্মরণীয় ত্যাগের কথা। দেশের অর্থনীতিতে এই বিপুলসংখ্যক মানুষের শ্রম, ঘাম ও আত্মত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি বলেন, প্রবাসীদের এই অসামান্য অবদানের জন্য তাঁদের যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও সম্মান প্রদর্শন করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান পবিত্র দায়িত্ব।

 

প্রবাসীরা কেবল দেশে অর্থই পাঠান না, বরং বিদেশের মাটিতে তারা প্রত্যেকেই লাল-সবুজের বাংলাদেশের এক একজন গর্বিত প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। প্রবাস জীবনে তারা যে অমূল্য জ্ঞান, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জন করেন, তা স্বাধীন বাংলাদেশের অমূল্য জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে।

 

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত ও আধুনিকায়িত পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে রাষ্ট্রপতি শুধুমাত্র অদক্ষ কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর চিরাচরিত ধারণার বাইরে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দেন।

 

তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় কেবল বিদেশে লোক পাঠানোই যথেষ্ট নয়; বরং পরিবর্তিত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ কর্মী তৈরি, তাদের জন্য উপযুক্ত ও সম্মানজনক কর্মসংস্থান এবং সর্বোপরি একটি শতভাগ নিরাপদ অভিবাসন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

 

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এখন সাধারণ শ্রমিকের চেয়ে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন, বিদেশি ভাষায় পারদর্শী, প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষ এবং উচ্চতর পেশাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীদের চাহিদা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

 

বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থা, চিকিৎসাবিজ্ঞানের অংশ হিসেবে নার্সিং ও স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত বিশ্বে বয়স্কদের বিশেষায়িত পরিচর্যা, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস প্রযুক্তি এবং আধুনিক নির্মাণশিল্পের মতো অত্যাধুনিক খাতগুলোতে দক্ষ কর্মীর অভাবনীয় বৈশ্বিক চাহিদা তৈরি হয়েছে।

 

বিশ্ববাজারের এই ক্রমবর্ধমান ও আধুনিক চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য বিধান করে দেশের সরকারি ও বেসরকারি কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বমানের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে আরও বেশি মনোযোগী ও যুগোপযোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

 

রাষ্ট্রপতি তাঁর সুচিন্তিত বক্তব্যে একটি তথ্যনির্ভর ও গবেষণালব্ধ প্রশিক্ষণ কাঠামোর ওপর জোর দেন। ঠিক কোন দেশে, কোন নির্দিষ্ট পেশায়, কী পরিমাণ কর্মীর চাহিদা রয়েছে এবং সেই শূন্যস্থান পূরণে কর্মীদের ঠিক কী ধরনের যোগ্যতা ও প্রায়োগিক দক্ষতা অর্জন করা অপরিহার্য-তার একটি নির্ভুল তথ্যভান্ডার তৈরির নির্দেশ দেন তিনি।

 

এই সুনির্দিষ্ট তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ভবিষ্যতের প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় পরিকল্পনা প্রণয়নের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি বিদেশি স্বনামধন্য নিয়োগকর্তা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক অংশীদারত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা বৃদ্ধিরও জোরালো আহ্বান জানান তিনি।

 

নারী অভিবাসীদের প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি অত্যন্ত সংবেদনশীলতার পরিচয় দিয়ে বলেন, বিদেশে কর্মরত নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, মানবিক অধিকার এবং সর্বোচ্চ সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

 

একই সঙ্গে তিনি প্রবাসীদের কষ্টার্জিত সঞ্চয়কে অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয়ের পরিবর্তে দেশের লাভজনক ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করার জন্য উৎসাহিত করার নীতি গ্রহণের কথা বলেন।

 

দেশে চিরতরে ফিরে আসা প্রবাসী কর্মীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্বাসন, বিদেশে অর্জিত তাদের পেশাগত দক্ষতার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান, সহজ শর্তে বিশেষায়িত ঋণসুবিধা এবং তাদের আত্মনির্ভরশীল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সব ধরনের নীতিগত সহায়তা প্রদানের ওপর তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করেন।

 

অভিবাসন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ জনসংখ্যা স্থানান্তর ও জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব নিয়েও রাষ্ট্রপতি তাঁর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, উন্নততর কর্মসংস্থান, মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক চিকিৎসাসেবা এবং একটি তুলনামূলক উন্নত জীবনের আশায় প্রতিনিয়ত গ্রামগঞ্জ থেকে লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন।

 

যদিও এর ফলে নতুন নতুন অর্থনৈতিক সুযোগের সৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে নগরীর আবাসন ব্যবস্থা, পরিবহন খাত, যানজট এবং নাগরিক সেবার মতো মৌলিক কাঠামোগুলোর ওপর ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত এবং অসহনীয় চাপ তৈরি হচ্ছে।

 

এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, প্রলয়ংকরী বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নির্মম প্রভাবে দেশের একটি বড় অংশের মানুষ নিজেদের আদি বসতি ছেড়ে অন্যত্র উদ্বাস্তু হতে বাধ্য হচ্ছেন।

 

অভ্যন্তরীণ এই বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাষ্ট্রপতি গ্রামীণ ও তুলনামূলক পিছিয়ে পড়া জনপদগুলোতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি প্রশিক্ষণের প্রসার, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের বিকাশ, কৃষিনির্ভর নতুন উদ্যোগ গ্রহণ এবং শহরের মতো সমান নাগরিক সেবার সুযোগ প্রত্যন্ত অঞ্চলে সম্প্রসারিত করার আহ্বান জানান।

 

পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত এলাকাগুলোতে পরিবেশগত অভিযোজন সক্ষমতা বৃদ্ধি, টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণ, যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য বিকল্প ও স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।

 

বাংলাদেশের সামগ্রিক অভিবাসন ব্যবস্থাপনাকে আরও বেশি আধুনিক, যুগোপযোগী ও কার্যকর করার লক্ষ্যে একটি সুদূরপ্রসারী, অত্যন্ত সমন্বিত এবং সুনির্দিষ্ট ফলাফলভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কৌশল গ্রহণ ও তার দ্রুত বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।

 

এ প্রসঙ্গে অভিবাসন খাতকে বিশেষ জাতীয় মনোযোগের কেন্দ্রে নিয়ে আসার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়কালকে 'অভিবাসন দশক' হিসেবে ঘোষণা করার যে প্রস্তাবনা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার জন্য সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান।

 

প্রবাসী কর্মীদের ন্যায্য অধিকার আদায় ও জীবনের সার্বিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার এই মহান জাতীয় কর্তব্যে সরকার, বিরোধী রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে সব ধরনের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানান রাষ্ট্রপ্রধান।

 

ভাষণের শেষ পর্যায়ে এসে রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও শ্রমশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি রচনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি জানান, দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী উদ্যোগেই মূলত এই খাতের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল।

 

১৯৭৬ সালে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের ঐকান্তিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত ৩৩টি দেশে প্রথমবারের মতো সরকারিভাবে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর একটি সুশৃঙ্খল ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল।

 

এ ছাড়া, অভিবাসীদের কল্যাণে ২০০১ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের শাসনামলে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠার যে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল, জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে সেই ঐতিহাসিক অবদানের কথাও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।

 

বর্তমান সরকারের গৃহিত বিভিন্ন ইতিবাচক ও জনকল্যাণমুখী উদ্যোগের প্রসঙ্গের অবতারণা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, অভিবাসীদের সুবিধার্থে বর্তমান প্রশাসন প্রবাসী কার্ড চালু করা, দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে পুনরায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানো শুরু করা, প্রবাসী কর্মীদের জন্য সহজ শর্তে দশ লাখ টাকা পর্যন্ত বিশেষ ঋণসুবিধার প্রবর্তন এবং অভিবাসন সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিরসনে বিশেষায়িত আদালত গঠনের মতো বেশ কিছু অত্যন্ত প্রশংসনীয় ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।

 

অনুষ্ঠানের একেবারে সমাপনী লগ্নে পুরস্কারপ্রাপ্ত সকল শ্রেষ্ঠ অভিবাসী ও সংশ্লিষ্টদের আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি গভীর আশা প্রকাশ করেন যে, আরএমএমআরইউ আগামী দিনগুলোতেও দেশের সামগ্রিক অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও বেশি নিরাপদ, সম্পূর্ণ সুশৃঙ্খল, মানবিক ও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই করার ক্ষেত্রে তাদের ইতিবাচক ও গবেষণাধর্মী ভূমিকা অব্যাহত রাখবে।

 

তিনি তাঁর আবেগপূর্ণ ভাষণের উপসংহারে বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা বৈদেশিক মুদ্রার প্রতিটি ডলারের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে বাংলার একজন সাধারণ মানুষের অক্লান্ত শ্রম, সীমাহীন ত্যাগ ও একটি সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

 

তাদের এই ন্যায্য অধিকার রক্ষা করা, সমাজে তাদের উপযুক্ত মর্যাদা নিশ্চিত করা এবং বিদেশের মাটিতে তাদের অর্জিত বহুমুখী জ্ঞান ও অমূল্য অভিজ্ঞতাকে মাতৃভূমির সার্বিক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে যথাযথভাবে কাজে লাগানো দেশের প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত ও নৈতিক দায়িত্ব।