রবিবার, নভেম্বর ১, ২০২৬
১৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পোশাকশ্রমিকদের দাবি মেনে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের বোর্ড গঠন

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৪০ পিএম

পোশাকশ্রমিকদের দাবি মেনে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে ছয় সদস্যের বোর্ড গঠন
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত তৈরি পোশাক খাতের চলমান চরম অস্থিতিশীলতা ও শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনের লক্ষ্যে একটি চূড়ান্ত ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার।

 

দেশজুড়ে চলমান তীব্র বিক্ষোভ, সংঘাত এবং শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দাবির প্রেক্ষিতে অবশেষে ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য ছয় সদস্য বিশিষ্ট একটি নতুন মজুরি বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।

 

রোববার, পহেলা নভেম্বর, ২০২৬ সালে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র সচিবালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ ও জরুরি সংবাদ সম্মেলনে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্তটি জাতির সামনে তুলে ধরেন।

 

সরকারের এই কৌশলগত পদক্ষেপ এমন এক সংকটময় মুহূর্তে এলো, যখন সারা দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলো শ্রমিকদের বেঁচে থাকার অধিকার আদায়ের আন্দোলনে রীতিমতো উত্তাল হয়ে উঠেছে এবং শিল্পের উৎপাদন ব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।

 

সরকারের এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার নেপথ্যে ছিল গভীর পর্যবেক্ষণ, আলোচনা ও ত্রিপক্ষীয় সংলাপের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর ঠিক আগের দিন, অর্থাৎ শনিবার, একত্রিশে অক্টোবর, রাজধানীর বিজয়নগরে অবস্থিত শ্রম ভবনে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, দীর্ঘ ও রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

 

শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই উচ্চপর্যায়ের ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দেশের তৈরি পোশাক খাতের মালিকদের শীর্ষস্থানীয় দুই সংগঠন-বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) প্রভাবশালী প্রতিনিধিরা।

 

দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টা ধরে চলা এই ম্যারাথন বৈঠকে শিল্প খাতের বর্তমান স্থবিরতা, শ্রমিকদের ক্ষোভের মূল কারণ এবং ভবিষ্যতের যেকোনো ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি এড়াতে আশু করণীয় নিয়ে অত্যন্ত খোলামেলা ও বিস্তারিত আলোচনা হয়।

 

শনিবারের ওই শ্বাসরুদ্ধকর বৈঠক শেষেই মন্ত্রী গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে এবং তাদের জীবনমানের টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে রোববারই একটি নতুন ও কার্যকর মজুরি বোর্ড গঠন করা হবে। সেই প্রতিশ্রুতিরই দ্রুত ও বাস্তব প্রতিফলন ঘটল রোববারের এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মধ্য দিয়ে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে পোশাক কারখানার শ্রমিকরা যে তীব্র ও অনড় আন্দোলন গড়ে তুলেছেন, তার মূলে রয়েছে প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট ও জীবনঘনিষ্ঠ দাবি। প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিটি হলো, বর্তমান আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারমূল্য, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ত্রিশ হাজার টাকায় উন্নীত করা।

 

দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে-চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও বাসস্থানের ব্যয় যে হারে জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে বর্তমানের অপ্রতুল মজুরি দিয়ে শ্রমিকদের পক্ষে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

তাদের দ্বিতীয় দাবিটি শিল্প খাতের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও মানবাধিকার সম্পর্কিত বিষয়, যা হলো শ্রমিকদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে 'কালো তালিকাভুক্তি' বা ব্ল্যাকলিস্টিং প্রথা অবিলম্বে ও চিরতরে বন্ধ করা।

 

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, শ্রমিক অধিকার নিয়ে কথা বললে বা কারখানার কোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে ন্যায্য প্রতিবাদ জানালে মালিকপক্ষ প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের কালো তালিকাভুক্ত করে রাখেন।

 

এর ফলে ওই নিরীহ শ্রমিকরা পরবর্তীতে অন্য কোনো কারখানায় কাজ পাওয়ার ন্যূনতম সুযোগ ও মৌলিক অধিকার থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হন। তৃতীয়ত, বিভিন্ন সময়ে অযৌক্তিকভাবে, বিনা নোটিশে বা মিথ্যা অভিযোগে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের সসম্মানে ও শর্তহীনভাবে পুনরায় চাকরিতে বহাল করার দাবিও এই চলমান বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করছে।

 

তবে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই মজুরি বোর্ড গঠনের ইতিবাচক আশ্বাস সত্ত্বেও শ্রমিকদের মাঠপর্যায়ের আন্দোলন এবং রাজপথের দখল রোববারও অব্যাহত ছিল। এদিন সকালের আলো ফোটার সাথে সাথেই রাজধানীর মিরপুর এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ ও স্পর্শকাতর শিল্পাঞ্চল গাজীপুরে হাজার হাজার পোশাকশ্রমিক তাদের দাবি আদায়ে একযোগে রাস্তায় নেমে আসেন এবং প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো সম্পূর্ণরূপে অবরোধ করে রাখেন।

 

এর ফলে এই দুই প্রধান এলাকায় সব ধরনের গণপরিবহন ও পণ্যবাহী যান চলাচল সম্পূর্ণভাবে স্তব্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা চরম দুর্ভোগের মুখে পড়ে। পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে থাকলে, অবরুদ্ধ সড়ক থেকে বিক্ষোভকারী শ্রমিকদের সরিয়ে দিয়ে জনজীবন ও যান চলাচল স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা চালায় পুলিশ।

 

আর তখনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সাথে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের দফায় দফায় ব্যাপক ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি একপর্যায়ে এতটাই উত্তপ্ত ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে পুরো মিরপুর ও গাজীপুর এলাকা রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।

 

পুলিশ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও জানমাল রক্ষার্থে কাঁদানে গ্যাস ও অন্যান্য আইনানুগ কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, অন্যদিকে অধিকার আদায়ে মরিয়া শ্রমিকরাও নিজেদের অবস্থানে অনড় থেকে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা চালান।

 

রোববারের এই সংঘাতময় ও ভীতিকর পরিস্থিতি মূলত আগের দিন শনিবারের লাগাতার সহিংসতার একটি বর্ধিত রূপ মাত্র। শনিবারও রাজধানীর মিরপুর, সাভার এবং গাজীপুরের মতো দেশের প্রধান ও ঘনবসতিপূর্ণ পোশাক শিল্পাঞ্চলগুলোতে শ্রমিকদের বিশাল বিক্ষোভ এবং লাগাতার সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছিল।

 

কেবল শান্তিপূর্ণ ন্যায্য বেতনের দাবিতে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শনিবার দুপুরের পর থেকেই এক পর্যায়ে চরম মাত্রায় ধ্বংসাত্মক ও সহিংস রূপ ধারণ করে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের একটি বড় অংশ ক্ষোভে ফেটে পড়ে বিভিন্ন কারখানা ভবন এবং কারখানার আশপাশে অবস্থিত বাণিজ্যিক বিপণিবিতানগুলোতে ব্যাপক ভাঙচুর ও তাণ্ডব চালান, যা পুরো শিল্প এলাকায় দেশি-বিদেশি ক্রেতা ও সাধারণ মানুষের মাঝে গভীর আতঙ্ক ও ভীতির সঞ্চার করে।

 

পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি হস্তক্ষেপ করে এবং তখন উভয় পক্ষের মধ্যে অত্যন্ত সংঘবদ্ধ ও তীব্র সংঘর্ষ বেঁধে যায়। শনিবারের এই ভয়াবহ সহিংস ঘটনাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও আন্দোলনরত শ্রমিকসহ অন্তত পনেরোজন গুরুতরভাবে আহত হন।

 

আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের এই লাগাতার সংঘাতময় পরিস্থিতি, ভাঙচুর ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার চিত্র আন্তর্জাতিক ক্রেতা গোষ্ঠী এবং বিনিয়োগকারীদের মাঝে বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা নিয়ে এক ধরনের গভীর নেতিবাচক বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকরা।

 

উদ্ভূত এই সার্বিক সংঘাতময় পরিস্থিতি নিরসন এবং নবগঠিত মজুরি বোর্ডের ভবিষ্যৎ ও কার্যকর কার্যক্রম প্রসঙ্গে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী অত্যন্ত দৃঢ় ও আশাবাদী মনোভাব ব্যক্ত করেছেন।

 

সংবাদ সম্মেলনে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, রাজপথে আন্দোলনরত শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান, কেন্দ্রীয় এবং অত্যন্ত যৌক্তিক দাবি ছিল তাদের মজুরি নতুন করে পর্যালোচনার জন্য একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মজুরি বোর্ড গঠন করা।

 

সরকার বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সাথে তাদের এই দাবিটি মেনে নিয়েছে এবং পোশাকশিল্পের মালিকদের শীর্ষ দুই সংগঠন-বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-ও বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে এই প্রক্রিয়ার সাথে পূর্ণাঙ্গভাবে একমত পোষণ করেছে।

 

মন্ত্রী উপস্থিত সাংবাদিকদের আরও নিশ্চিত করে জানান যে, এই বোর্ডে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ শতভাগ রক্ষার জন্য শ্রমিক প্রতিনিধিরাও ইতোমধ্যে তাদের মনোনীত ও যোগ্য সদস্যদের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছেন।

 

সমস্ত আইনি ও দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে রোববারের মধ্যেই এই ছয় সদস্য বিশিষ্ট মজুরি বোর্ড গঠনের সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে বলে তিনি চূড়ান্ত নিশ্চয়তা প্রদান করেন। সরকারের এই সময়োপযোগী ও দ্রুত পদক্ষেপ এবং একইসাথে মালিক ও শ্রমিক পক্ষের সম্মিলিত ও আন্তরিক উদ্যোগের ফলে তৈরি পোশাক শিল্পে চলমান এই তীব্র অস্থিরতা ও সংঘাতের অতি দ্রুত অবসান ঘটবে।

 

সংশ্লিষ্ট সকল মহলের এখন একটাই প্রত্যাশা-খুব শিগগিরই আলোচনার টেবিলে একটি সম্মানজনক ও বাস্তবসম্মত মজুরি নির্ধারিত হবে এবং কারখানার চাকা আবারও তার স্বাভাবিক ও চিরচেনা গতিতে ঘুরতে শুরু করবে, যা দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে।