শ্রমিকদের এই অবস্থান কর্মসূচি একপর্যায়ে উত্তপ্ত রূপ ধারণ করে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো সাধারণত শ্রম অধিকার ও শিল্পখাতের এই ধরনের সংঘাতকে গভীর উদ্বেগের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে থাকে, কারণ এটি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
আশুলিয়ার এই আন্দোলনে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে, যা পুরো শিল্পাঞ্চলে এক ভীতিকর ও থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। তবে এই ব্যাপক উত্তেজনার মাঝেও আশার কথা হলো, সাভারের অন্যান্য এলাকার পোশাক কারখানাগুলোতে শ্রমিকরা যথারীতি তাদের কর্মস্থলে যোগ দিয়েছেন এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছেন।
শিল্পাঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা শিল্প পুলিশ ও আন্দোলনরত পোশাক শ্রমিকদের বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই অস্থিরতার সূত্রপাত ঘটে মূলত সকালে। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে ন্যূনতম বেতন বৃদ্ধির দাবি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে তিন দফা সুনির্দিষ্ট দাবি নিয়ে শ্রমিকরা রাজপথে নেমে আসেন।
সকালের দিকে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের বাড়ইপাড়া নামক স্থানে বিপুল সংখ্যক পোশাক শ্রমিক একত্র হয়ে মহাসড়কে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন। তাদের এই অবরোধের কারণে ওই অঞ্চলের যান চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।
পরিস্থিতির অবনতি ঘটার আশঙ্কায় আশুলিয়া থানা পুলিশের একটি বিশাল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। তারা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে শ্রমিকদের বুঝিয়ে এবং আলোচনা করে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হন। কিন্তু আন্দোলনের রেশ সেখানেই থেমে থাকেনি।
এর ঠিক কাছাকাছি সময়ে নিশ্চিন্তপুর এলাকায় অবস্থিত নিউ এইজ নামক পোশাক কারখানার উত্তেজিত শ্রমিকরা কারখানার ভেতরে প্রবেশ করে তাদের পূর্বঘোষিত কর্মবিরতি কর্মসূচি পালন করতে শুরু করেন।
নিশ্চিন্তপুর এলাকায় কর্মবিরতি পালনের পর বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের দলটি ক্রমশ সংঘবদ্ধ হয়ে বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর মহাসড়কের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এক পর্যায়ে তারা ওই সড়কের পাশে অবস্থিত অনন্ত পোশাক কারখানার সামনে এসে বিশাল এক সমাবেশ গড়ে তোলে।
শ্রমিকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও বৃহৎ জমায়েত দেখে আশপাশের কারখানা কর্তৃপক্ষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিক অসন্তোষ ও সম্ভাব্য ভাঙচুরের হাত থেকে কারখানার সম্পদ এবং সাধারণ কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে ওই এলাকার বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য পোশাক কারখানা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কারখানা হলো নিট এশিয়া, আল-মুসলিম, ট্রাউজার লাইন এবং অনন্ত পোশাক কারখানা। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের ঝুঁকি না নিয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। কারখানাগুলো ছুটি ঘোষণার পরপরই আন্দোলনরত শ্রমিকরা পুনরায় মহাসড়কে এসে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করেন।
ঠিক তখনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের বাধা প্রদান করেন। পুলিশি বাধার মুখে শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং এক পর্যায়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করেন।
আত্মরক্ষার্থে এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশও পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যার ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে তীব্র ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে এই সংঘাতময় পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো গুরুতর হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, যা কিছুটা স্বস্তির বিষয়।
এই আন্দোলনের পেছনের কারণ এবং শ্রমিকদের বর্তমান মানসিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নিউ এইজ পোশাক কারখানার এক সাধারণ শ্রমিক অত্যন্ত আবেগপ্রবণ ও হতাশাগ্রস্ত কণ্ঠে নিজেদের দাবি ও বঞ্চনার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, তারা শুধুমাত্র তাদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার এবং ন্যায্য পাওনা আদায়ের লক্ষ্যেই এই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের উদ্দেশ্য কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা নয়, বরং তারা সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের দাবিগুলো কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।
কিন্তু তার অভিযোগ, তাদের এই নিয়মতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ অবস্থানে পুলিশ এসে অতর্কিতভাবে বাধা প্রদান করে এবং তাদের ধাওয়া দেয়। সাধারণ এই শ্রমিক আরও একটি গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করেন।
তিনি দাবি করেন যে, তাদের এই যৌক্তিক আন্দোলনকে দমন করার হীন উদ্দেশ্যে পুলিশ গত রোববার তাদের কারখানার নিরপরাধ দুই শ্রমিককে অকারণে গ্রেপ্তার করে নিয়ে গেছে। তিনি অবিলম্বে এবং নিঃশর্তভাবে গ্রেপ্তারকৃত ওই দুই নিরীহ পোশাক শ্রমিকের মুক্তি দাবি করেন।
তার এই বক্তব্য থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে তাদের নিরাপত্তা এবং অধিকার আদায়ের বিষয়ে চরম ক্ষোভ ও গভীর হতাশা বিরাজ করছে, যা যেকোনো সময় আরও বৃহত্তর আন্দোলনের রূপ নিতে পারে।
শ্রমিকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন এবং পুলিশের ভূমিকা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু একটি অত্যন্ত জোরালো ও প্রতিবাদী বিবৃতি প্রদান করেছেন।
তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, সোমবার সকালে নির্ধারিত সময়ে বেশ কয়েকটি পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা যথারীতি প্রবেশ করলেও তারা কাজে যোগ না দিয়ে কর্মবিরতি পালন করা শুরু করেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নিউ এইজ পোশাক কারখানার শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের প্রধান কারণ হলো তাদের সহকর্মীদের আটক করা।
তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, রোববার পুলিশ বিনা উসকানিতে ওই কারখানার দুই শ্রমিককে আটক করেছে, যার প্রতিবাদে সোমবারও শ্রমিকরা বিক্ষোভে ফেটে পড়েছেন। খাইরুল মামুন মিন্টু অত্যন্ত কঠোর ভাষায় পুলিশের এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পোশাক শ্রমিকদের নিজেদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তাদের এই অধিকার আদায়ের গণতান্ত্রিক ও ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করতে শ্রমিকদের আটক করার যে ঘটনা ঘটেছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান এবং অবিলম্বে আটককৃতদের মুক্তি দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানান। পুরো পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ সম্পর্কে আশুলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমের কাছে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিয়েছেন।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে তিনি ঢাকা পোস্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, সকালে পোশাক শ্রমিকদের একটি বড় অংশ নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কে অবস্থান গ্রহণ করেছিল। এর পাশাপাশি আরেকটি দল বাইপাইল-আবদুল্লাহপুর মহাসড়কেও অবরোধ সৃষ্টি করার চেষ্টা করে।
পরিস্থিতি নাজুক হওয়ার আগেই পুলিশ ধৈর্য ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে শ্রমিকদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে সক্ষম হয়। তিনি আরও জানান যে, শিল্পাঞ্চলে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
তবে শ্রমিকদের গ্রেপ্তারের অভিযোগের বিষয়ে তিনি ভিন্ন তথ্য দেন। তিনি জানান যে, রোববার নিউ এইজ কারখানা থেকে বিশৃঙ্খলার সন্দেহে কেবল একজন শ্রমিককে পুলিশ আটক করেছে, দুজনের কথা সঠিক নয়। অন্যদিকে, আশুলিয়া শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া শিল্পাঞ্চলের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথা জানান।
তিনি বলেন, বিরাজমান শ্রমিক অসন্তোষের কারণে গতকাল রোববার আশুলিয়া অঞ্চলের অন্তত ১৭৭টি পোশাক কারখানা বাধ্য হয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছিল। সোমবারের পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি জানান, চারদিকের অবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক না থাকায় আজ কতগুলো কারখানা চালু রয়েছে এবং কতগুলো বন্ধ, তার সঠিক পরিসংখ্যান তাৎক্ষণিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন এবং যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছেন বলে আশ্বস্ত করেছেন। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে পোশাক শিল্পের অবদান অপরিসীম। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান এবং দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগই আসে এই খাত থেকে।
তাই আশুলিয়ার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রাণবন্ত একটি শিল্পাঞ্চলে এমন অস্থিরতা ও শ্রমিক-পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়। শ্রমিকদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম দাবি যেমন ন্যায্য, তেমনি দেশের বৃহত্তর স্বার্থে শিল্পাঞ্চলের শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখাও সমানভাবে জরুরি।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, যেকোনো শ্রম অসন্তোষ দমনে বলপ্রয়োগের পরিবর্তে গঠনমূলক আলোচনা এবং ত্রিপক্ষীয় সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা বাঞ্ছনীয়। সংশ্লিষ্ট সকল মহলের এখন প্রধান দায়িত্ব হলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর আলোচনার মাধ্যমে এই সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিশ্চিত করা, যাতে করে দেশের অন্যতম প্রধান এই শিল্পখাত কোনো বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন না হয় এবং একইসঙ্গে শ্রমিকদের অধিকারও সুরক্ষিত থাকে।