বুধবার, অক্টোবর ৭, ২০২৬
২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতীয় স্বার্থে কোনো ছাড় নয়, নিজস্ব পথে অবিচল ইরান: পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:০০ পিএম

জাতীয় স্বার্থে কোনো ছাড় নয়, নিজস্ব পথে অবিচল ইরান: পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি
ছবি : Collected

সমকালীন বৈশ্বিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের চরম সংবেদনশীল ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিজেদের অবস্থান আরও একবার সুস্পষ্ট করল ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান। রাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা এবং জনকল্যাণের প্রশ্নে কোনো ধরনের ছাড় দিতে নারাজ তেহরান।

 

বহির্বিশ্বের যেকোনো চাপ বা প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে সম্পূর্ণ নিজস্ব নীতি ও পথে চলার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন ইরানের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি। আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিজেদের এই দ্ব্যর্থহীন বার্তা পৌঁছে দিতে তেহরান এক বিশেষ কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার মাধ্যমে বিশ্বনেতাদের কাছে ইরানের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা তুলে ধরা হচ্ছে।

 

একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের আত্মমর্যাদা ও অধিকার সমুন্নত রাখার এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গভীর তাৎপর্য বহন করে। সম্প্রতি রাজধানী তেহরানে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে মিলিত হন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি।

 

এই বিশেষ কূটনৈতিক সভায় উপস্থিত ছিলেন তেহরানে নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের মান্যবর রাষ্ট্রদূত, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মিশনের প্রধান এবং বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধিরা।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পার্সটুডের এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। মূলত বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ইরানের রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভবিষ্যৎ পদক্ষেপগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ সভার আয়োজন করা হয়।

 

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইরান তার পররাষ্ট্রনীতিতে ঠিক কোন বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে, তা বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে সরাসরি ব্যাখ্যা করার জন্য এই বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত সময়োপযোগী একটি পদক্ষেপ।

 

এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক সুদীর্ঘ ও তথ্যবহুল বার্তার মাধ্যমে সভার বিস্তারিত বিবরণ এবং এর মূল উদ্দেশ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি।

 

সেখানে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, রোববার অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানা জটিল সমীকরণ নিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সুনির্দিষ্ট ও অনড় অবস্থান বিদেশি প্রতিনিধিদের সামনে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

 

তিনি তার বার্তায় এই বিষয়টি বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেন যে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার এই চরম সংবেদনশীল মুহূর্তে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক পরামর্শ ও সরাসরি সংলাপ অব্যাহত রাখা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী তার বিবৃতিতে আরও ব্যাখ্যা করেন যে, বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে এই ধরনের খোলামেলা আলোচনার প্রধান উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান বিভিন্ন অপপ্রচার বা ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটানো।

 

এর মাধ্যমে বৈশ্বিক রাজনীতিতে ইরানের প্রকৃত অবস্থান, নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিদ্যমান বাস্তব পরিস্থিতির একটি সঠিক ও স্বচ্ছ চিত্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হবে। কূটনীতিতে সংলাপের কোনো বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি জানান, ইরান সর্বদা গঠনমূলক আলোচনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তবে সেই আলোচনা হতে হবে সমমর্যাদা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে।

 

কোনো অবস্থাতেই জাতীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে কোনো ধরনের আপস বা চুক্তিতে উপনীত হবে না তেহরান। রাষ্ট্রীয় নীতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান তার স্বাধীন কূটনীতি, জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা এবং সাধারণ জনগণের কল্যাণের ওপর ভিত্তি করে অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

 

রাষ্ট্রের এই পথচলায় কোনো বহিঃশক্তির অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ বা চাপ কখনোই তেহরানকে তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। নিজের দেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ থেকে তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রিয় মাতৃভূমি ইরানের বৈশ্বিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করতে এবং রাষ্ট্রীয় সীমানার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার তাদের হাতে থাকা সব ধরনের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও হাতিয়ার সর্বোচ্চ পর্যায়ে কাজে লাগাতে বদ্ধপরিকর।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে এক ধরনের অস্থিতিশীল ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর নানামুখী চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের এক তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ইরান তার নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

 

এই ধরনের পরিস্থিতিতে তেহরানে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকদের ডেকে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সরাসরি অবহিত করার রেওয়াজ আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়। এর মাধ্যমে ইরান মূলত পশ্চিমা বিশ্বসহ তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে এই বার্তাই দিতে চাইছে যে, তারা যেমন নিজেদের সুরক্ষায় প্রস্তুত, ঠিক তেমনি যেকোনো আন্তর্জাতিক সংকটে তারা তাদের নিজস্ব নীতিগত অবস্থান থেকে একচুলও সরবে না।

 

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য তার জাতীয় স্বার্থই হলো যেকোনো অভ্যন্তরীণ বা বৈদেশিক নীতির মূল চালিকাশক্তি। ইরানের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক, কারণ গত কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রটিকে বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে হয়েছে।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচির বক্তব্যে সেই ঐতিহাসিক দৃঢ়তারই প্রতিফলন ঘটেছে। ‘নিজস্ব পথ অনুসরণ’ বলতে তিনি মূলত এমন এক স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কথা বুঝিয়েছেন, যা কোনো বৈশ্বিক পরাশক্তির বলয়ে আবদ্ধ নয়, বরং যা সম্পূর্ণভাবে ইরানের নিজস্ব ভূরাজনৈতিক প্রয়োজন, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের দ্বারা পরিচালিত।

 

এই নীতির ওপর ভর করেই ইরান আগামী দিনগুলোতে বিশ্বমঞ্চে নিজেদের আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও শক্তিশালী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। কূটনৈতিক শিষ্টাচার বজায় রেখে সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার যে আগ্রহ ইরান দেখিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

 

তবে এই সংলাপের আড়ালে তেহরান যে তাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের দুর্বলতা প্রদর্শন করবে না, সেটিও অত্যন্ত সুনিপুণভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্মানজনক সম্পর্ক বজায় রাখা-এই দুইয়ের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করেই চলছে ইরানের বর্তমান সরকার।

 

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাম্প্রতিক এই বৈঠক ও তার পরবর্তী বিবৃতি মূলত সেই ভারসাম্যপূর্ণ ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কূটনৈতিক যাত্রারই একটি আনুষ্ঠানিক ও অত্যন্ত জোরালো ঘোষণা। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থায় কূটনীতি কেবল বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যম নয়, বরং এটি বৈরী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানো এবং নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করার একটি শক্তিশালী কৌশল। ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব এই কৌশলটিকে অত্যন্ত কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে।

 

একদিকে তারা তাদের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো খোলা রেখে বিশ্বকে তাদের যৌক্তিক অবস্থান বোঝার সুযোগ দিচ্ছে।

 

আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের এই মতবিনিময় সভায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে ইরান প্রমাণ করেছে যে, তারা বৈশ্বিক নিয়মকানুন ও বহুপাক্ষিক কাঠামোর প্রতি দায়বদ্ধ, তবে সেই দায়বদ্ধতা কখনোই তাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে হতে পারে না।

 

এই স্পষ্ট বার্তাটি আগামী দিনের বিশ্ব রাজনীতিতে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো ভবিষ্যৎ শান্তি আলোচনা বা চুক্তিতে একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।

 

- পার্সটুডে