রাজনৈতিক মহলে এই পদায়নকে তাঁর রাজনৈতিক অবমূল্যায়ন বা এক প্রকার পদাবনতি হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছিল, যা নিয়ে অন্তর্জালে এবং দেশের সমগ্র রাজনৈতিক পরিসরে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।
তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বৃহস্পতিবার, পাঁচই নভেম্বর, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি সুদীর্ঘ ও বিশ্লেষণধর্মী বিবৃতির মাধ্যমে তিনি তাঁর পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করেন।
এই বার্তায় তিনি কেবল দল ছাড়ার কারণই স্পষ্ট করেননি, বরং জাতীয় নাগরিক পার্টির বর্তমান রাজনৈতিক গতিপথ, জোট-রাজনীতির কৌশল এবং দলীয় নেতৃত্বের আদর্শিক বিচ্যুতির তীব্র সমালোচনা করেছেন।
সামান্তা শারমিন তাঁর প্রদত্ত বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, প্রায় এক বছর পূর্বেই জাতীয় নাগরিক পার্টির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং নীতিগতভাবে সুদৃঢ় একটি অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর অভিমত ছিল, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নীতিগত বা কৌশলগত-কোনো বিচারেই জাতীয় নাগরিক পার্টির মিত্র হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।
তিনি আগেই সতর্ক করেছিলেন, এমন একটি জোট গঠন করা হলে জাতীয় নাগরিক পার্টিকে তার জন্য চড়া মূল্য চোকাতে হবে। বিগত এগারো মাস ধরে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বোঝাপড়া থেকে তিনি দলের অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করেছেন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যখনই সুযোগ পেয়েছেন, তখনই দলীয় ফোরামে লিখিতভাবে অভিযোগ, প্রস্তাবনা ও নিরন্তর আলাপ-আলোচনা চালিয়ে গেছেন।
তিনি বিশ্বাস করেন, যেকোনো রাজনৈতিক সংগঠনে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, তবে দল যখন মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনাকে তিনি তাঁর অবশ্যম্ভাবী রাজনৈতিক কর্তব্য বলে মনে করেছেন।
সেই কর্তব্য পালনের তাগিদেই তিনি দলের অভ্যন্তরে দীর্ঘ মতাদর্শিক সংগ্রাম চালিয়ে আসছিলেন। দলের গৃহীত নীতিগুলোকে স্বীকৃত গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে থেকে যুক্তিসঙ্গত উপায়ে চ্যালেঞ্জ করা ছাড়া দলকে সঠিক পথে ফেরানোর আর কোনো গণতান্ত্রিক পন্থা তাঁর সামনে উন্মুক্ত ছিল না।
কিন্তু এক বছরের এই নিরলস সংগ্রামের পর তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, দলের প্রতিষ্ঠাকালীন মূল্যবোধের প্রতি বর্তমান নেতৃত্বের আর আন্তরিক হওয়ার কোনো সম্ভাবনা অবশিষ্ট নেই।
পদত্যাগ করার জন্য অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক কোনো সময়ের প্রহর গোনা তাঁর কাছে অর্থহীন বলে প্রতীয়মান হয়েছে। পুরোনো রাজনৈতিক ধাঁচের বাইরে গিয়ে নিজস্ব চিন্তা ও কর্মসূচি প্রণয়নে দলটির অক্ষমতা তাঁকে এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।
দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে তাঁর মতপার্থক্যের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গাটি ছিল রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সংস্কারের ধারণাকে কেন্দ্র করে। দেশের আপামর জনসাধারণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করাই ছিল জাতীয় নাগরিক পার্টির প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হতে হলে রাষ্ট্রের বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে অন্তত তিনটি মৌলিক জায়গায় সংস্কার সাধন করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। প্রথমত, সংবিধানে নিহিত থাকা স্বৈরতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী ভিত্তির মূলোৎপাটন করে পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক সংস্কার।
দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র পরিচালনার আইনি কাঠামোকে গণবিরোধী অবস্থান থেকে সরিয়ে জনকল্যাণমুখী করার লক্ষ্যে ব্যাপক আইনি সংস্কার। তৃতীয়ত, চিরাচরিত ঔপনিবেশিক ধাঁচের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত সংস্কার সাধন করা।
সামান্তা শারমিন দৃঢ়তার সাথে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই তিনটি মৌলিক সংস্কারের একটিকেও তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক দর্শনের অংশ বলে মনে করে না। সংগঠনটির মূল দার্শনিক ভিত্তি কোনোভাবেই আধুনিক ও উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অনুগামী নয়।
গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে সংস্কারের যে দাবি উঠেছে, তা কেবল নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার্থে ব্যবহার করার একটি কৌশলমাত্র। গণতান্ত্রিক কাঠামোর সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে পরিশেষে একটি একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই তাদের রাজনৈতিক অভিপ্রায়।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের মানবতাবিরোধী ভূমিকাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করা এবং জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনায় অস্বীকৃতি জানানো তাদের সেই পুরোনো দার্শনিক ভিত্তিরই প্রমাণ বহন করে।
এমন একটি দলের সাথে যখন জাতীয় নাগরিক পার্টি মিত্রতা স্থাপন করে, তখন দেশের উদার ও গণতান্ত্রিক চেতনার সাধারণ মানুষ-যাঁরা প্রকৃত অর্থেই সংস্কারকামী-তাঁরা হতাশ হয়ে এই দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
আসন্ন নির্বাচনের ক্ষেত্রেও দলটির কৌশলগত বিচ্যুতির কথা তিনি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। ছাব্বিশ সালের জাতীয় নির্বাচনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যান্য যুগান্তকারী নির্বাচনগুলোর মতোই একটি বড় ধরনের মোড় পরিবর্তনের নির্বাচন হতে পারত।
যেমনটা বাংলার মানুষ দেখেছিল ছেচল্লিশ, চুয়ান্ন, সত্তর কিংবা নব্বই সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনগুলোতে। আসন্ন নির্বাচনটিকে কেবল ক্ষমতার হাতবদলের মাধ্যম না বানিয়ে বরং একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ জাতীয় নাগরিক পার্টির সামনে ছিল।
নির্বাচন কমিশন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সংস্কার কার্যক্রমে সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, পুরোনো ব্যবস্থাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার জন্য সমমনা শক্তিদের নিয়ে অথবা একা হলেও নির্বাচনে অবতীর্ণ হওয়ার মতো সাহসী পদক্ষেপ দলটির নেওয়া উচিত ছিল।
কিন্তু ইতিহাসের এই শিক্ষাকে অবজ্ঞা করে তারা একটি বড় রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করার সুবিধাবাদী পথ বেছে নেয়। এগারো দলীয় ঐক্যের মতো চিরাচরিত নির্বাচনি কৌশল গ্রহণ করার ফলে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনীতির যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা নিঃশেষ হয়ে গেছে।
রাজনৈতিক বিজয়ের চেয়ে কেবল নির্বাচনি বিজয়কে বড় করে দেখার ফলে দলটির গ্রহণযোগ্যতা আজ ক্ষুণ্ণ হয়েছে। এমনকি নির্বাচনি প্রচারণার ক্ষেত্রে শহীদ ওসমান হাদির আত্মত্যাগকে ব্যবহার করে বড় দলের সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার যে যুক্তি দেখানো হয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অযৌক্তিক বলে তিনি আখ্যায়িত করেছেন।
তাঁর পদত্যাগপত্রের অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি ছিল চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নারীদের অংশীদারিত্ব এবং বিজয়ের পর অত্যন্ত সুকৌশলে তাঁদের অধিকার হরণের প্রসঙ্গ। পৃথিবীর আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাসে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকা কোনো জনআন্দোলন কখনোই ব্যর্থতার মুখ দেখেনি।
বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানেও নারীরা ছিলেন সম্মুখসারির অকুতোভয় যোদ্ধা এবং রক্ষাকর্তা। নারীদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, ন্যায্য হিস্যা আদায়ের সংকল্প এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে তাঁদের সাহসী অবস্থানই ছিল এই গণজাগরণের ভিত্তি।
তাঁরা কেবল মিছিলে অংশগ্রহণই করেননি, বরং ব্যারিকেডের সামনে দাঁড়িয়ে পুরো আন্দোলনকে একটি সর্বজনীন রূপ দান করেছিলেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, বিজয়ের পরপরই পুরোনো রক্ষণশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো নারীদের সেই বিজয়ের ময়দান থেকে পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়।
সামান্তা শারমিন আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, আন্দোলনের দিনগুলোতে যেসব সামাজিক প্রতিবন্ধকতা নারীদের থামাতে পারেনি, বিজয়ের পর ঠিক সেগুলোকেই নারীদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়েছে।
নারীবিহীন একটি রাজনৈতিক মাঠ পুনর্নির্মাণের এই অপচেষ্টায় জাতীয় নাগরিক পার্টিও শামিল হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির সামনে অনন্য সুযোগ ছিল নারী-পুরুষের সমতার ভিত্তিতে একটি নতুন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করার।
এর জন্য দলে শুধু নারীদের অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট ছিল না; বরং নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সাংগঠনিক ক্ষমতার প্রতিটি স্তরে তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করা অপরিহার্য ছিল। কিন্তু দলটি সেই প্রগতিশীল পথ পরিহার করে রক্ষণশীলতার কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।
দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় একান্ন শতাংশ নারী হওয়া সত্ত্বেও, তাঁদের কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করে কেবল পুরুষতান্ত্রিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দলীয় সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণ করা হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে পড়া নারীদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য রাজনীতিতে ইতিবাচক বৈষম্য বা বিশেষ সুযোগ প্রদান করা অত্যন্ত জরুরি, সেখানে নারীদের আরও পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়ার এই প্রবণতা চরম হতাশাজনক। চরম ডানপন্থী শক্তিগুলোর নারীবিদ্বেষী আচরণের নীরব সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে দলটি।
বিবৃতির শেষাংশে তিনি একটি গভীর ও মৌলিক প্রশ্ন জাতির সামনে উত্থাপন করেন। আন্দোলনের সংকটময় মুহূর্তে নারীদের মিছিলে সামনের সারিতে রাখাটা কি তাঁদের নেতৃত্বের স্বীকৃতি ছিল, নাকি কেবল বিপদের মুখে নিরাপত্তাবলয় হিসেবে তাঁদের ব্যবহার করার কৌশল মাত্র?
যদি বিজয়ের পর ক্ষমতা কাঠামোতে নারীদের সেই ন্যায্য হিস্যা অস্বীকারই করা হয়, তবে তাঁদের সেই অপরিসীম ত্যাগের প্রকৃত স্বীকৃতি কোথায়? যে ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের জন্ম হয়েছিল সকল প্রকার বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে, সেই আন্দোলনের উত্তরাধিকার দাবি করা কোনো রাজনৈতিক দল কখনোই নিজের কাঠামোর অভ্যন্তরে বৈষম্যমূলক সম্পর্কের জন্ম দিতে পারে না।
সার্বিক বিবেচনায়, একটি প্রকৃত বৈষম্যবিরোধী এবং সংস্কারমুখী রাজনৈতিক দলের যে মূল্যবোধ থাকা উচিত, জাতীয় নাগরিক পার্টি তা হারিয়ে ফেলায় অত্যন্ত ক্ষোভ ও হতাশা নিয়ে সামান্তা শারমিন দল থেকে চূড়ান্তভাবে সরে দাঁড়ানোর এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।