তিনি স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারের সমালোচনা করা কিংবা রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করা একটি স্বাভাবিক রাজনৈতিক অধিকার হলেও, একটি জাতীয় সংকটের মুহূর্তে কেবল আন্দোলনের পথে না হেঁটে বরং সংকট সমাধানের বাস্তবসম্মত পথ নির্দেশ করা বিরোধী দলের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা অ্যাকাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে আয়োজিত বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির এক আড়ম্বরপূর্ণ অভিষেক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি সমসাময়িক রাজনীতি এবং অর্থনীতির এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন।
দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে বিএনপির এই শীর্ষ নেতা জানান, বর্তমানে দেশে যে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি বা বর্তমান সরকারের কোনো একক সিদ্ধান্তে সৃষ্টি হয়নি।
মূলত আন্তর্জাতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি, বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির আকস্মিক পরিবর্তন এবং সর্বোপরি বিগত সরকারের গ্রহণ করা চরম ভুল ও অদূরদর্শী নীতিমালার কারণেই আজকের এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, বিরোধী দল গ্যাস এবং বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের দাবিতে রাজপথে লংমার্চের মতো কর্মসূচি দিতেই পারে, গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে এতে সরকারের কোনো বাধা নেই।
তবে শুধুমাত্র রাজপথ উত্তপ্ত না করে তাদের উচিত একটি সুনির্দিষ্ট বিকল্প পরিকল্পনা জাতির সামনে তুলে ধরা। দেশের এই সংকটকালীন সময়ে কোথা থেকে, কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় জ্বালানি বা বিদ্যুৎ পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে সংসদে সুচিন্তিত মতামত ও কার্যকর রূপরেখা প্রদান করাটাই হবে প্রকৃত দেশপ্রেমের পরিচায়ক।
সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকার ওপর আলোকপাত করে রুহুল কবির রিজভী স্মরণ করিয়ে দেন যে, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের কথা বলার এবং নীতি নির্ধারণী আলোচনায় অংশ নেওয়ার পর্যাপ্ত ও অবারিত সুযোগ রয়েছে।
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সরকার কী ধরনের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে, সে সম্পর্কে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একটি সুস্পষ্ট, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং সময়োপযোগী লিখিত পরিকল্পনা সংসদে উপস্থাপন করা উচিত।
তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে দেশে একটি পরিকল্পিত অচলাবস্থা তৈরি করা কোনোভাবেই দেশ ও জাতির জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। বরং কীভাবে এই সংকট থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দেওয়া যায়, সেই বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে।
অতীতের মতো সংঘাতময় ও ধ্বংসাত্মক রাজনীতির পুনরাবৃত্তি ঘটলে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ এবং অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে বলেও তিনি গভীরভাবে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
জ্বালানি সংকটের আন্তর্জাতিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করে রিজভী উপস্থিত দর্শকদের জানান, বর্তমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে মূলত বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার চরম বিঘ্নিত অবস্থাই সবচেয়ে বেশি দায়ী।
বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনে অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা সৃষ্টি হওয়ার ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে এক বিরাট শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রয়োজনীয় জ্বালানি আমদানির ক্ষেত্রে।
এই বিষয়টি সম্পূর্ণ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের অংশ এবং এটি সরকারের নিজস্ব কোনো নীতিগত ব্যর্থতা বা ইচ্ছাকৃত কোনো কারণের ফলে ঘটেনি বলে তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে দাবি করেন। তার মতে, বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতার সময়ে অভ্যন্তরীণভাবে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থেকে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি রুহুল কবির রিজভী দেশের সাম্প্রতিক গণআন্দোলনে সাংস্কৃতিক কর্মীদের অসামান্য অবদানের কথাও অত্যন্ত কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন। তিনি জুলাই মাসের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের কথা উল্লেখ করে বলেন, সেই উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথের আন্দোলনকারীদের মধ্যে গান, কবিতা এবং নৃত্যের মতো বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এক অসীম সাহস ও নতুন প্রাণশক্তির সঞ্চার করেছিল।
সাংস্কৃতিক কর্মীদের এই শৈল্পিক প্রতিবাদ গণআন্দোলনকে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিতে বিশাল ভূমিকা পালন করেছে। বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির এই অভিষেক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্থার সভাপতি ফারহানা বেবী।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রাখেন সড়ক পরিবহন ও রেলপথ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, বিএনপির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন উজ্জ্বল, প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেতা হেলাল খান এবং জাকির হোসেন রুকনসহ আরও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।