শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬
২০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সংস্কার ও গণরায়ের বাস্তবায়ন না হলে সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হবে না

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৮:৪২ পিএম

সংস্কার ও গণরায়ের বাস্তবায়ন না হলে সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে দেওয়া হবে না
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত কঠোর ও সুস্পষ্ট বার্তা প্রদান করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দ্ব্যর্থহীন ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, সাধারণ মানুষের দেওয়া গণরায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে রাষ্ট্রকাঠামোর কাঙ্ক্ষিত সংস্কার পূর্ণাঙ্গরূপে বাস্তবায়ন করা না হলে বর্তমান সরকারকে কোনোভাবেই আর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকতে দেওয়া হবে না।

 

শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় আয়োজিত এক বিশাল গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই আপসহীন অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। দেশের বিচার ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় সরকার এবং গণমাধ্যমসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর আমূল সংস্কারের যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই সরকার ক্ষমতায় এসেছিল, তা দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য তিনি সরকারের প্রতি জোরালো দাবি জানান।

 

নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে সাম্প্রতিক অনুষ্ঠিত গণভোটের প্রসঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি উপস্থিত জনতার উদ্দেশে স্মরণ করিয়ে দেন যে, রাষ্ট্রকাঠামোর দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তনের লক্ষ্যেই সাধারণ মানুষকে গণভোটে সংস্কারের পক্ষে রায় প্রদানের জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছিল।

 

দেশের আপামর জনতা সেই আহ্বানে বিপুলভাবে সাড়া দিয়ে নিজেদের জোরালো রায় প্রদান করেছে। জনগণের প্রত্যাশা ছিল, এই ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে দেশের পুলিশ প্রশাসন, বিচার বিভাগ, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা এবং স্বাধীন গণমাধ্যমের মতো রাষ্ট্রের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভগুলোর আমূল সংস্কার সাধিত হবে।

 

কিন্তু সরকার যদি এখন সেই রায়ের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করে এবং প্রতিশ্রুত সংস্কার কার্যক্রম থেকে ক্রমাগত পিছিয়ে আসে, তবে দেশের সাধারণ জনগণও তাদের ক্ষমতা থেকে টেনে নামাতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।

 

জনজীবনের চরম দুর্দশা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকট এবং দেশজুড়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির প্রতিবাদে মূলত এই গণসমাবেশের আয়োজন করা হয়। সমাবেশে নাহিদ ইসলাম বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, দেশে এখন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

 

একদিকে সাধারণ মানুষ দৈনন্দিন জীবনযাপনে হিমশিম খাচ্ছে, অন্যদিকে সর্বত্র চাঁদাবাজ ও দখলদারদের অবাধ দৌরাত্ম্য চলছে। তিনি সরকারকে সরাসরি সতর্ক করে বলেন, অবিলম্বে যদি শিল্পকারখানা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা না হয় এবং জ্বালানির মূল্য সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নামিয়ে আনা না হয়, তবে দেশের উৎপাদন খাত সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়বে।

 

বর্তমানে দেশব্যাপী ব্যাপক চাঁদাবাজির কারণে সাধারণ ব্যবসায়ীরা নিজেদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। সরকারের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধেও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির এই শীর্ষ নেতা।

 

তিনি ক্ষমতাসীনদের স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, দেশের আপামর জনসাধারণ ভোট দিয়ে একটি নতুন সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে কেবল রাষ্ট্রকাঠামোর লুটপাট বন্ধ করে জনকল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য; রাজনৈতিক নেতাদের নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নের জন্য নয়।

 

তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বসে যদি জনগণের সেবার বদলে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠজনেরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সরকারি কেনাকাটা বা দরপত্র নিয়ে কারসাজি ও লুটপাটে মেতে ওঠে, তবে দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ তা কখনোই মেনে নেবে না।

 

সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে যাত্রাবাড়ী এলাকার অসামান্য অবদানের কথা অত্যন্ত আবেগঘন ও সংবেদনশীল ভাষায় তুলে ধরেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সেই রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানে যাত্রাবাড়ী ছিল অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

 

অথচ আজ সেই এলাকার বাসিন্দাদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে নগরবাসী যখন ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে, তখন সেই অভ্যুত্থানের বীর যোদ্ধারাও এক বুক হতাশা নিয়ে দিন পার করছেন।

 

সমাবেশে উপস্থিত শহীদ পরিবারের সদস্য এবং অভ্যুত্থানে অঙ্গহানি হওয়া বা দৃষ্টিশক্তি হারানো আহত যোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি বলেন, এই বীর জনতার আত্মত্যাগের কারণেই আজকের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

 

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত নির্মম হত্যাকাণ্ডের কাঙ্ক্ষিত বিচার এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। নাহিদ ইসলাম হতাশা ব্যক্ত করে জানান, পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বিচার প্রক্রিয়ার যেটুকু প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছিল, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তা সেখানেই থমকে আছে।

 

এরপর থেকে দৃশ্যমান কোনো আইনি অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়নি। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি চলতে থাকলে সরকার তীব্র জনরোষের মুখে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই সমাবেশটি মূলত সরকারের প্রতি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক চূড়ান্ত সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে না পারলে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল যে অবশ্যম্ভাবী, সেই বার্তাই অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে দেশের আপামর জনতার সামনে তুলে ধরা হয়েছে।