শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে অবস্থিত বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি ও বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই দাবি তুলে ধরেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে একটি নতুন সরকারের যাত্রার প্রাথমিক মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি জানান, সরকার তার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার কোথাও শতভাগ, আবার কোথাও নব্বই থেকে পঁচানব্বই শতাংশ পর্যন্ত লক্ষ্য ইতিমধ্যেই অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে।
এটি নিঃসন্দেহে একটি নবগঠিত সরকারের প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার ইতিবাচক প্রতিফলন। সরকারের এই প্রথম ছয় মাসের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড ও ধারাবাহিক অর্জনের একটি বিস্তারিত ও বস্তুনিষ্ঠ পরিসংখ্যান খুব শিগগিরই দেশের গণমাধ্যম ও সাধারণ জনগণের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হবে বলে এই জ্যেষ্ঠ নেতা নিশ্চিত করেছেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, সরকারের যাবতীয় গঠনমূলক কাজের একটি সুবিন্যস্ত ও লিখিত বিবরণী সাংবাদিকদের হাতে সরবরাহ করা হবে। ওই বিবরণীতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন যুগান্তকারী ও জনমুখী উদ্যোগ, যেমন-সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য পরিবার কার্ড, কৃষিজীবী মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কৃষক কার্ড এবং সেচব্যবস্থার প্রসারে দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর সুনির্দিষ্ট ও তথ্যনির্ভর পরিসংখ্যান অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
রিজভীর মতে, এই ব্যাপক কর্মসূচিগুলো দেশব্যাপী সুচারুরূপে ও নির্ভুলভাবে বাস্তবায়নের জন্য মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও কাঠামোগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করতেই এই প্রাথমিক সময়টুকু অতিবাহিত হয়েছে।
তবে প্রশাসনিক ভিত্তি এখন যথেষ্ট মজবুত হওয়ায় আগামী ছয় মাসে সরকারের এই উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো আরও অনেক বেশি জোরালো, দৃশ্যমান ও দ্রুতগতিতে বাস্তবায়িত হবে বলে তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সদ্য বহুল আলোচিত একটি বিষয়, অর্থাৎ বিএনপির বর্তমান মহাসচিবের দেশের সর্বোচ্চ পদ রাষ্ট্রপতির আসনে মনোনয়ন লাভ এবং তার তৎপরবর্তী দল থেকে পদত্যাগের বিষয়টিও সাংবাদিকদের প্রশ্নের কারণে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।
এই প্রশ্নের জবাবে রুহুল কবির রিজভী অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে আইনি কাঠামোর পাশাপাশি নৈতিকতার দিকগুলোও তুলে ধরেন। তিনি বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে বলেন যে, দেশের প্রচলিত আইনি বিধান অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণের পূর্বে কোনো রাজনৈতিক দল বা সরকারের অন্য কোনো পদ থেকে পদত্যাগ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
তা সত্ত্বেও, রাজনৈতিক শুদ্ধাচার, স্বচ্ছতা এবং উচ্চতর নৈতিকতার জায়গা থেকে দলের মহাসচিবের পদ থেকে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন, যা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি পরিচ্ছন্ন ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
এ ছাড়া, এই গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনের প্রারম্ভিক বক্তব্যে রিজভী অত্যন্ত গভীর শ্রদ্ধা ও আবেগের সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ, কণ্টকাকীর্ণ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের নানাদিক নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের স্বাধীনতা, ভৌগোলিক সার্বভৌমত্ব সুরক্ষা এবং অবরুদ্ধ গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কঠিন সংগ্রামে বেগম জিয়া কখনোই তাঁর আপসহীন অবস্থান থেকে তিলমাত্র বিচ্যুত হননি। আর ঠিক এই অতুলনীয় রাজনৈতিক দৃঢ়তা ও দেশপ্রেমের কারণেই তাঁকে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অবর্ণনীয় দুঃখ, কষ্ট ও চরম রাজনৈতিক নিপীড়ন মুখ বুজে সহ্য করতে হয়েছে।
বিশেষত, আশির দশকের শেষ ও নব্বইয়ের দশকের শুরুতে তৎকালীন স্বৈরাচারবিরোধী তুমুল গণআন্দোলনে তাঁর অসামান্য ও সাহসী নেতৃত্বের কথা স্মরণ করে রিজভী বলেন, তৎকালীন ছাত্র-জনতার সেই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মূল প্রেরণা ও মূর্ত প্রতীক ছিলেন তিনি।
শনিবার এই প্রবীণ নেত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে দেশব্যাপী বিএনপির প্রতিটি দলীয় কার্যালয়ে বিশেষ দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শনিবার বেলা এগারোটায় এবং গুলশান কার্যালয়ে আসরের নামাজের পর বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হবে বলে জানানো হয়।
দলের অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি সাম্প্রতিক বার্তার সূত্র ধরে সংগঠনে বড় কোনো কাঠামোগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা রয়েছে কি না, গণমাধ্যমকর্মীদের এমন প্রশ্নেরও অত্যন্ত সাবলীল জবাব দেন রিজভী।
তিনি পেশাদারির সঙ্গে জানান যে, দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে এ বিষয়ে তাঁর কাছে এখন পর্যন্ত কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা বা বার্তা এসে পৌঁছায়নি। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অভ্যন্তরীণভাবে এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়ে থাকলেও তা তাঁর অবগত নয় বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
একই সঙ্গে তিনি আশ্বাস দেন যে, এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে তা যথানিয়মে আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমেই গণমাধ্যম ও দেশবাসীকে অবহিত করা হবে। পরিশেষে, তিনি বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিনের কর্মসূচিগুলোকে জাতীয় আবেগের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে তা সংবাদমাধ্যমে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচারের জন্য উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রতি বিনীত আহ্বান জানান।
এই জরুরি সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, হাবিব উন নবী খান সোহেল, স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু এবং প্রধানমন্ত্রীর গবেষণা কর্মকর্তা আব্দুস সাত্তার পাটোয়ারীসহ দলের বিভিন্ন স্তরের জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ।