তবে দেশের নির্ভরযোগ্য তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার তাদের বিশ্লেষণে নিশ্চিত করেছে যে, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি ভুয়া নয়, বরং সম্পূর্ণ আসল। এই তথ্য প্রকাশের পর জেলা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, ভিডিওতে দৃশ্যমান ওই নারী সংসদ সদস্য নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী।
পরবর্তীতে সংসদ সদস্য নিজেও ওই নারীকে নিজের বিবাহিত দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি একটি চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন যে, রাজধানী ঢাকার মগবাজারের একটি অফিসে তাকে জিম্মি করে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়েছে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের স্বামী-স্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও গোপনে ধারণ করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার দুপুর বারোটার দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের যাচাইকৃত অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ ও বিস্তারিত পোস্টে গাজী নজরুল ইসলাম পুরো ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেন।
তিনি তার পোস্টে উল্লেখ করেন যে, গত ১৩ই জুলাই, ২০২৬ তারিখে তিনি তার প্রথমা স্ত্রী মোছা. মাকছুদা বেগম এবং দ্বিতীয়া স্ত্রী মোছা. মরিয়ম বেগমকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত তার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতা মো. মাসুম বিল্লাহর ব্যবসায়িক কার্যালয়ে যান। সেখানে তারা আনুমানিক সোয়া এক ঘণ্টা সময় অতিবাহিত করেন।
কার্যালয়ে অবস্থানকালে জোহরের নামাজ আদায়ের কিছুক্ষণ পূর্বে তার গাড়িচালক এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর মামা ওবায়দুল্লাহ গাড়ি দেখার কথা বলে কক্ষের বাইরে যান। সংসদ সদস্যের অভিযোগ অনুযায়ী, কিছুক্ষণ পর ওবায়দুল্লাহ পাঁচ থেকে সাতজন সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে জোরপূর্বক তাদের কক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে তারা উপস্থিত সবাইকে জিম্মি করে নগদ এক লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেন।
সাংসদ আরও দাবি করেন যে, তিনি চলাচলের জন্য যে ভাড়ায় চালিত গাড়িটি ব্যবহার করতেন, ওবায়দুল্লাহর সরাসরি যোগসাজশে দুর্বৃত্তরা সেটিও আটকে রাখে এবং পরবর্তীতে দফায় দফায় তাদের কাছে আরও কয়েক লাখ টাকা দাবি করতে থাকে।
এই অযৌক্তিক ও বেআইনি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দুর্বৃত্তরা তাদের বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করে। ওই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে তিনি জানতে পারেন যে, তার দ্বিতীয় স্ত্রীর পিতা মো. মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে ওবায়দুল্লাহর আগে থেকেই শত্রুতা ও গভীর পারিবারিক বিরোধ ছিল এবং সেই পূর্বশত্রুতার জের ধরেই এই জিম্মি নাটক ও চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটানো হয়েছে।
নিজের ব্যক্তিগত ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সংসদ সদস্য জানান যে, পরবর্তীতে চরম হিংসা এবং ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার অসৎ উদ্দেশ্যে ওবায়দুল্লাহ গোপনে তাদের স্বামী-স্ত্রীর অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ধারণ করেন।
এরপর তাকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য সেই ভিডিও ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে কতিপয় অসাধু ব্যক্তি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভিডিওটিকে একটি অবৈধ বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা হিসেবে প্রচার করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বিষয়টিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে তিনি স্পষ্ট করেন যে, গত ১৭ই জুন, ২০২৬ তারিখে পারিবারিকভাবে এবং তার প্রথম স্ত্রীর পূর্ণ সম্মতিক্রমে দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম বেগমের পিতার বাসভবনে তাদের এই বিবাহ আইনানুগভাবে সম্পন্ন হয়।
সুতরাং তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের কোনো বাস্তব সত্যতা নেই বলে তিনি দাবি করেন। যারা তাদের পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং নৈতিক চরিত্র ক্ষুণ্ন করার গভীর ষড়যন্ত্র ও নোংরা অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে এত বড় একটি অপরাধমূলক ঘটনার শিকার হওয়ার পরও গাজী নজরুল ইসলাম তাৎক্ষণিকভাবে কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশ্রয় নেননি বা কোনো আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি, তা নিয়ে নাগরিক সমাজে ও রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এই ব্যাখ্যামূলক পোস্টের নিচে সাধারণ মানুষ বিভিন্ন ধরনের মিশ্র ও সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। দিদারুল ইসলাম নিটন নামের একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন যে, শুরুতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অজুহাত দিয়ে পার না পেয়ে এখন জিম্মি হওয়ার নতুন গল্প সাজানো হয়েছে, যা তাদের দ্বৈত চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।
বাবু আমদাদ নামের আরেকজন ব্যবহারকারী কিছুটা ব্যঙ্গাত্মক সুরে লিখেছেন যে, পুরুষ সব সময়ই মজলুম এবং তিনি নিঃশর্তভাবে সংসদ সদস্যের পক্ষে আছেন। অন্যদিকে, আবু বকর সিদ্দিক নামের একজন মন্তব্যকারী পুরো বিষয়টির ব্যবস্থাপনা নিয়ে কটাক্ষ করে লিখেছেন যে, সবকিছু সামাল দিতে সাংসদ অনেক দেরি করে ফেলেছেন।
প্রথমা স্ত্রী, দ্বিতীয়া স্ত্রী এবং শ্বশুরবাড়ির লোকদের মিলিয়ে দুটি আলাদা পরিবারকে সামলানো যে কতটা কঠিন, তা উল্লেখ করে তিনি ব্যঙ্গাত্মক শুভকামনা জানিয়েছেন। জাহিদুর রহমান নামের অপর এক ব্যক্তি সংসদ সদস্যের বয়সের দিকে ইঙ্গিত করে তীব্র সমালোচনা করেছেন।
তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, জীবনের এই পড়ন্ত বয়সে এসে কীভাবে একজন ব্যক্তি ১৮ বছরের এক তরুণীকে বিয়ে করতে পারেন। জনগণকে বিভ্রান্তিকর গল্প না শুনিয়ে সরাসরি সংবাদ সম্মেলন করে প্রকৃত সত্য তুলে ধরার জন্যও তিনি আহ্বান জানিয়েছেন।