আজ শুক্রবার, ২১ আগস্ট, পবিত্র জুমার নামাজের পর তিনি রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত জিয়া উদ্যানে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের মানদণ্ডে এটি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা নতুন রাষ্ট্রপ্রধানের শেকড়ের প্রতি অবিচল দায়বদ্ধতা প্রমাণ করে।
শ্রদ্ধা নিবেদনের এই বিশেষ মুহূর্তে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির সাথে দলীয় ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতির চেয়ে তাঁর ব্যক্তিগত আবেগ ও ভাবগাম্ভীর্য বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর তিনি সেখানে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং দুই প্রয়াত শীর্ষ নেতার আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও মোনাজাতে অংশগ্রহণ করেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই দুই নেতার অবদানকে স্মরণ করে মির্জা ফখরুল তাঁর আসন্ন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য একপ্রকার আত্মিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছেন বলে প্রবীণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পথপরিক্রমায় যাঁদের নেতৃত্বে তিনি রাজনীতি করেছেন, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে শপথ নেওয়ার আগে তাঁদের প্রতি এই সম্মান প্রদর্শন তাঁর রাজনৈতিক মূল্যবোধের গভীরতাকেই সুচারুভাবে প্রতিফলিত করে। সমাজের নানা স্তরের মানুষ নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির এই বিনম্র আচরণকে অত্যন্ত ইতিবাচক ও শ্রদ্ধার চোখে দেখছেন।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের সদস্যদের সরাসরি ভোটে বাংলাদেশের নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। দেশের চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় সংসদ সদস্যদের এই প্রত্যক্ষ ভোটাভুটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
একটি গণতান্ত্রিক কাঠামোতে জনপ্রতিনিধিদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের এই প্রক্রিয়াটি দেশি ও বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কাছেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। বিরোধী রাজনীতি থেকে উঠে এসে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবকের দায়িত্ব গ্রহণের এই যুগান্তকারী ঘটনা জাতীয় রাজনীতিতে নতুন এক মাত্রা যুক্ত করেছে, যা ভবিষ্যতে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
দেশের আপামর জনসাধারণের প্রত্যাশা, তিনি দলমত নির্বিশেষে সকলের প্রতি সমান ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করবেন এবং সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে থেকে দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় অবিস্মরণীয় অবদান রাখবেন।
আজ সন্ধ্যায় দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় বাসভবন বঙ্গভবনে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির আনুষ্ঠানিক শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তকে স্মরণীয় করে রাখতে বঙ্গভবনের ঐতিহ্যবাহী দরবার হলে বর্ণাঢ্য ও রাজকীয় প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, শপথ অনুষ্ঠানের সব ধরনের প্রশাসনিক ও রীতিনীতি সংক্রান্ত কাজ চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং সুসজ্জিত দরবার হল এখন নতুন রাষ্ট্রপতিকে সসম্মানে বরণ করে নেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
রাষ্ট্রীয় এই মর্যাদাপূর্ণ অনুষ্ঠানে সরকার ও রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিদেশি কূটনীতিকরা উপস্থিত থাকবেন বলে গভীরভাবে আশা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রপতির এই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজধানী ঢাকার সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে। আমন্ত্রিত দেশি-বিদেশি এবং রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের বঙ্গভবনে নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ঢাকা মহানগর পুলিশের যানবাহন নিয়ন্ত্রণ বিভাগ বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে।
যানজট এড়াতে এবং সর্বোচ্চ স্তরের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা রীতিনীতি বজায় রাখতে রাজধানীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সড়কে আজ নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সাধারণ যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হবে অথবা বিকল্প পথে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে।
নগরবাসীকে এ বিষয়ে পূর্বেই বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমের সাহায্যে বিস্তারিত অবহিত করা হয়েছে, যাতে জনদুর্ভোগ ন্যূনতম পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয় এবং অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা যায়।
অন্যদিকে, দেশে চলমান এই রাজনৈতিক পালাবদল এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাঝেও রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হামিদুর রহমান আজ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে মন্তব্য করেছেন যে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিরোধীদলের অংশগ্রহণকে সরকার অত্যন্ত সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন করছে।
তাঁর এই সুনির্দিষ্ট মন্তব্য প্রমাণ করে যে, নতুন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের উৎসবমুখর পরিবেশের পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকারি ও বিরোধী শিবিরের মধ্যকার মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক বোঝাপড়ার বিষয়টি এখনো যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক ও অমীমাংসিত।
তবে যাবতীয় সমালোচনা ও রাজনৈতিক বিভেদ ছাপিয়ে আজ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রবীণ এই রাজনীতিক সমগ্র জাতির অবিভাবক হিসেবে তাঁর নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছেন, যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন, সম্ভাবনাময় ও ঐক্যবদ্ধ যুগের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।