শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে রাজধানী ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই অভিযোগ করেন। সম্প্রতি বিরোধী দলের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি আদায় না হলে রাজপথে কঠোর আন্দোলনের যে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, তার তীব্র সমালোচনা করে তিনি সরকারের অবস্থান সুস্পষ্ট করেন।
বিএনপি মহাসচিব অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, তাঁর দল জুলাই সনদে উল্লেখিত প্রতিটি অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ফ্যাসিবাদবিরোধী গণআন্দোলনের সময় সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিএনপিও এই ঐতিহাসিক সনদে যৌথভাবে স্বাক্ষর করেছিল।
জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপপ্রয়াসকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দল নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর তাদের নিজস্ব নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী প্রতিশ্রুতিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করবে, যা জুলাই সনদের মূল গ্রন্থেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
সরকার তাদের প্রতিশ্রুত একত্রিশ দফা রূপরেখার মতোই জুলাই সনদের প্রতিও পূর্ণাঙ্গরূপে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে তিনি জাতিকে আশ্বস্ত করেন। রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত গণভোট এবং সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন প্রসঙ্গে বিরোধী দলের দাবির বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের সুস্পষ্ট দ্বিমত প্রকাশ করেন।
তিনি জানান, যে গণভোটের কথা বর্তমানে জোরালোভাবে প্রচার করা হচ্ছে, তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিয়ে অতীতে বিএনপির সঙ্গে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক বা ফলপ্রসূ আলোচনাই হয়নি। বিশেষ করে, আইনসভার উচ্চকক্ষে আনুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার যে প্রস্তাব সংস্কার কমিশন এককভাবে উত্থাপন করেছিল, বিএনপি শুরু থেকেই তার ঘোর বিরোধিতা করে এসেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোর পূর্বানুমতি বা সম্মতি ছাড়াই সংস্কার কমিশন সেই সময়ে এই প্রস্তাবগুলো সামনে এনেছিল, যা মূলত জাতির সঙ্গে একধরনের রাজনৈতিক প্রতারণা শামিল ছিল।
সংবিধানের পরিবর্তন প্রসঙ্গে মির্জা ফখরুল সুস্পষ্ট বিভাজন রেখা টেনে বলেন, বিএনপি কখনোই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন বা সংবিধানের আমূল সংস্কারের কথা বলেনি; বরং তারা যুগে যুগে সাংবিধানিক সংশোধনের পক্ষে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে।
দেশের গণতান্ত্রিক বিবর্তনে বিএনপির ঐতিহাসিক অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, একদলীয় শাসনব্যবস্থার অন্ধকার যুগ থেকে দেশকে মুক্ত করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছিল বিএনপি।
একইসঙ্গে, রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন এবং একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংসদে দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার কৃতিত্বও বিএনপির।
এই ঐতিহাসিক সত্যগুলোকে আড়াল করে আজ যারা নতুন করে সংস্কারের স্লোগান তুলছেন, তারা মূলত রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চাইছেন। বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা এবং জনসমর্থনের ভিত্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের আপামর জনসাধারণ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখেই সাম্প্রতিক নির্বাচনে তাদের বিপুল ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছে।
সংসদীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার যে ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট বিএনপি অর্জন করেছে, তা দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষারই সুস্পষ্ট প্রতিফলন। এমতাবস্থায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো ধরনের সংশয় বা বিভ্রান্তির অবকাশ নেই বলে তিনি মনে করেন।
তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে মন্তব্য করেন যে, বিরোধী দল দেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করে শুধুমাত্র যেকোনো উপায়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি হিসেবে এই জুলাই সনদকে ব্যবহার করার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে।
বিগত স্বৈরাচারী সরকারের আমলের ভয়াবহ নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত লড়াই করতে গিয়ে বিএনপির প্রায় ষাট লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের এই সুদীর্ঘ সংগ্রামে দলের প্রায় সতেরো শত নেতাকর্মী গুমের শিকার হয়েছেন এবং হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এত বিশাল আত্মত্যাগের বিনিময়ে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জাতি যে ফ্যাসিবাদমুক্ত একটি নতুন গণতান্ত্রিক পরিবেশ পেয়েছে, তাকে কোনোভাবেই নস্যাৎ হতে দেওয়া যাবেবিধা নেই।
তিনি সমাজ ও রাষ্ট্রে বিভাজনের রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে একটি উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের পথে অগ্রসর হওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, পরবর্তীকালে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের ঐক্যবদ্ধ চেতনার ওপর দাঁড়িয়ে একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়াই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
উল্লেখ্য, শুক্রবারের এই মর্যাদাপূর্ণ স্মরণসভাটি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত। প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমেদ রিসার্চ সেন্টার এবং জাতীয় সাংবাদিক সমিতির যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার উল্লাহ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
অন্যান্যের মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল আহসান, এমাজউদ্দীন আহমেদ রিসার্চ সেন্টারের আহ্বায়ক অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, বিশিষ্ট কবি ও দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার, আবুল কাশেম হায়দার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোস্তফা কামাল মজুমদার, এম আবদুল্লাহ, অধ্যাপক ওমর ফারুক, অধ্যাপক শেখ সাদী এবং কবি নাহিদ নজরুল প্রমুখ বক্তব্য প্রদান করেন। সভার শেষাংশে প্রয়াত অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের রুহের মাগফিরাত ও চিরশান্তি কামনা করে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করা হয়।