বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৬, ২০২৬
১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জীবন দেব, তবু ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের অর্জন কোনোভাবেই হারাতে দেব না

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ জুলাই, ২০২৬, ০৩:৩৯ পিএম

জীবন দেব, তবু ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের অর্জন কোনোভাবেই হারাতে দেব না
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও অর্জনকে কোনোভাবেই ম্লান হতে দেওয়া হবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

 

তিনি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, দেশের ছাত্র-জনতা ও সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই সাফল্যকে অতীতের মতো কোনো লুটেরা গোষ্ঠীর হাতে ছিনতাই হতে দেওয়া হবে না।

 

বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানী ঢাকার কাকরাইলে অবস্থিত ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) মিলনায়তনে আয়োজিত এক স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

 

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদসহ অন্যান্য বীর শহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের উদ্যোগে এই আলোচনা সভা ও দোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

 

ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. নূরুল ইসলাম বুলবুলের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে দলটির শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

 

অনুষ্ঠানে দেওয়া দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যে জামায়াত আমির বর্তমান সরকার ও সংসদের ভিত্তি হিসেবে ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে যে সরকার দেশ পরিচালনা করছে এবং যে সংসদ গঠিত হয়েছে, তার পুরোটাই ২৪-এর ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের ফসল।

 

সরকার সংশ্লিষ্ট কয়েকজন মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন যে, একটি মহল সুকৌশলে ২০২৪ সালের আন্দোলনকে গুরুত্বহীন করে পূর্ববর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহকে বড় করে দেখানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

 

অতীতের আন্দোলন ও ত্যাগের কথা স্মরণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী কখনোই অতীতের রাজনৈতিক আত্মত্যাগকে অস্বীকার করে না। বিগত বছরগুলোতে দলটির শীর্ষ এগারো জন নেতাকে জীবন দিতে হয়েছে, অসংখ্য নেতাকর্মী কারাবরণ করেছেন, চাকরি হারিয়েছেন এবং ভিটেমাটিছাড়া হয়েছেন।

 

কিন্তু এই চরম সত্যটিকেও অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে, ২০২৪ সালের সফল গণঅভ্যুত্থান না হলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার গঠন করতে পারতেন না এবং তিনিও আজ সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসতে পারতেন না।

 

জাতীয় সংসদে এবং গণমাধ্যমে সরকারের কয়েকজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, অনেকেই অবিবেচকের মতো দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্য করে চলেছেন।

 

অতীতমুখী রাজনীতির সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি একটি লোকজ প্রবাদের উদাহরণ টেনে বলেন, চিংড়ি মাছ লাফ দিলে পেছনের দিকে যায়, ফলে সামনে এগোনোর রাস্তা খুঁজে পায় না। একইভাবে একটি জাতি যদি প্রতিনিয়ত কেবল অতীতের দিকেই তাকিয়ে থাকে, তবে তারা ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হতে পারবে না।

 

জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্ম একটি বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। তাদের প্রধান দাবি ছিল রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত একটি সমাজ গঠন, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।

 

তরুণরা কারও কাছে করুণা বা ভিক্ষা চায়নি, তারা কেবল নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চেয়েছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই প্রতিশ্রুতির কোনো দৃশ্যমান প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি তীব্র হতাশা ব্যক্ত করেন।

 

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সাংবিধানিক সংস্কার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান সাম্প্রতিক গণভোটের প্রসঙ্গটি জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ যেন আর কখনোই দেশে ফিরে আসতে না পারে, সেই লক্ষ্যে রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল সংস্কার প্রয়োজন ছিল।

 

নির্বাচনের আগে সব রাজনৈতিক দল গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিলেও এখন অনেকেই এর বিরোধিতা করছেন। গণভোটের চারটি প্রশ্নকে অত্যন্ত জটিল বলে একটি মহল যে দাবি করেছে, তার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষকে অবমূল্যায়ন করার এই প্রবণতা সমগ্র জাতির জন্য অপমানজনক।

 

সাধারণ মানুষ যদি এই চারটি প্রশ্ন বুঝতে না পারে, তবে দীর্ঘ রাজনৈতিক ইশতেহার কীভাবে বুঝবে? তিনি প্রশ্ন তোলেন, দেশের প্রায় সত্তর শতাংশ মানুষ গণভোটে পক্ষে রায় দেওয়ার পরও ৫১ শতাংশ ভোট পেয়ে গঠিত সরকার কীভাবে সেই বিপুল জনমতকে উপেক্ষা করতে পারে।

 

নির্বাচনের দিন সাড়ে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন (ব্ল্যাকআউট) থাকার প্রসঙ্গ টেনে তিনি নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এছাড়া সংসদে উত্থাপিত ‘সংবিধান সংশোধন কমিটি’র বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, সংবিধানে এমন কোনো কাঠামোর অস্তিত্ব নেই।

 

মূলত গণভোট ও জুলাইয়ের অর্জনকে ভুলিয়ে দেওয়ার জন্যই এসব কাল্পনিক কমিটির অবতারণা করা হচ্ছে এবং এর প্রতিবাদ স্বরূপ তার দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেছে। বক্তব্যের শেষাংশে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কের বিষয়টিও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান।

 

তিনি বলেন, ভারত বাংলাদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের মাটিতে আমন্ত্রণ জানালেও একমাত্র জামায়াতে ইসলামীকে তারা লাল কার্ড দেখিয়েছে। তবে এই লাল কার্ড নিয়ে তার দল বিন্দুমাত্র বিচলিত নয়।

 

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, জামায়াতে ইসলামী কখনোই ভিনদেশের মাটিতে রাজনৈতিক আশ্রয় খোঁজার কথা চিন্তাও করে না। বাংলাদেশের আঠারো কোটি মানুষের হৃদয়ই তাদের প্রধান আশ্রয়স্থল এবং দেশের জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তারা সর্বদা রাজপথে সক্রিয় থাকবেন।