বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারি সুবিধা গ্রহণ অপরাধ নয়, তবে আমরা প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সচেষ্ট- জামায়াত আমির

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম

সরকারি সুবিধা গ্রহণ অপরাধ নয়, তবে আমরা প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সচেষ্ট- জামায়াত আমির
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং সংসদীয় আচরণের মানদণ্ড নিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও একবার স্পষ্ট করল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির আমির এবং জাতীয় সংসদের বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে রাষ্ট্র প্রদত্ত আইনি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা কোনো অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না।

 

তবে তার দল দেশবাসীর কাছে দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যথাসম্ভব এসব সরকারি সুবিধা এড়িয়ে চলার নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। বুধবার, ১ জুলাই জাতীয় সংসদের এলডি হলে আয়োজিত সাংবাদিকদের সঙ্গে এক নির্বাচন ও বাজেট-পরবর্তী বিশেষ মতবিনিময় সভায় তিনি এই মন্তব্য করেন।

 

গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তার এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিদের সরকারি কোষাগার থেকে বিভিন্ন ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের বিষয়টি দীর্ঘকাল ধরেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত বিষয়।

 

দেশের সাধারণ জনগণের একটি বড় অংশ মনে করেন, জনপ্রতিনিধিদের উচিত রাষ্ট্রের সম্পদের প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীল হওয়া। এই বৃহত্তর জনপ্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে বিগত সাধারণ নির্বাচনের সময় জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলোর কথা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেন ডা. শফিকুর রহমান।

 

তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, নির্বাচনের আগেই তারা জনগণের সামনে প্রকাশ্যে ওয়াদা করেছিলেন, তাদের দল থেকে নির্বাচিত কোনো সদস্য-তিনি সাধারণ সংসদ সদস্য হোন কিংবা মন্ত্রী-কেউই রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যবহার করে বা শুল্কমুক্ত সুবিধায় ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয় করবেন না।

 

একইসঙ্গে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া কোনো আবাসিক প্লটও তারা নিজেদের নামে বরাদ্দ নেবেন না বলে অঙ্গীকার করেছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন যে, তারা এখন পর্যন্ত সেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটবে না।

 

তবে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের এই আদর্শিক অবস্থানকে অন্যান্য দলের বা ব্যক্তির উপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া বা তাদের আইনি অধিকার খর্ব করার পক্ষে নন বিরোধীদলীয় এই শীর্ষ নেতা।

 

তিনি অত্যন্ত যৌক্তিক ও গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাখ্যা করেন যে, রাষ্ট্র বা সংবিধান একজন জনপ্রতিনিধিকে তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালনের সুবিধার্থে আইনত যেসব সুযোগ-সুবিধা প্রদান করে, তা গ্রহণ করা কোনোভাবেই বেআইনি বা অপরাধমূলক কাজ হতে পারে না।

 

সংসদের অন্যান্য সদস্য চাইলে তা আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে বৈধভাবেই গ্রহণ করতে পারেন এবং এতে নৈতিক স্খলনের কিছু নেই। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় এবং দেশের সাধারণ করদাতা জনগণের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে নিজেদের জন্য এই কঠোর মিতব্যয়ী নীতি নির্ধারণ করেছে।

 

বক্তব্যের এক পর্যায়ে সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওঠা কিছু সমালোচনা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তির কড়া জবাব দেন ডা. শফিকুর রহমান। বিশেষ করে সংসদ সদস্যদের জন্য নির্ধারিত সরকারি ফ্ল্যাট বা বাসভবন ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতিক মহলে যে অযাচিত বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকে তিনি অত্যন্ত অনভিপ্রেত বলে আখ্যায়িত করেন।

 

এ প্রসঙ্গে তিনি একটি প্রচলিত প্রবাদের অবতারণা করে বলেন, কিছু সমালোচক সবসময়ই ভালো কাজের মধ্যে খোঁড়া যুক্তি দিয়ে খুঁত ধরতে পছন্দ করেন এবং 'গুড়ের সঙ্গে কিছুটা লবণ ছিটিয়ে' পরিস্থিতি ঘোলাটে করে তৃপ্তি পান।

 

তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেশবাসীর উদ্দেশে জানান যে, সরকারি প্লট স্থায়ীভাবে নিজের নামে বরাদ্দ নেওয়া এবং সংসদীয় দায়িত্ব পালনের জন্য সরকারি ফ্ল্যাট সাময়িকভাবে ব্যবহার করা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। এই দুই বিষয়কে এক করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।

 

বিরোধীদলীয় নেতা বিষয়টি আরও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে বলেন, জাতীয় সংসদের সদস্যদের দাপ্তরিক ও সংসদীয় কার্যাবলি নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনার জন্য রাজধানী শহরে সরকারিভাবে যেসব ফ্ল্যাট বা বাসভবন নির্ধারিত থাকে, তা কখনোই কোনো সংসদ সদস্যকে স্থায়ীভাবে বা মালিকানা সত্ত্বে দিয়ে দেওয়া হয় না।

 

এটি কেবল একটি সাময়িক আবাসন ব্যবস্থা মাত্র, যা রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে ব্যবহৃত হয়। সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল-নির্বিশেষে নির্বাচিত সকল সংসদ সদস্যই তাদের নির্দিষ্ট মেয়াদকালের জন্য এই বাসভবন ব্যবহারের বৈধ অধিকার রাখেন।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন, যতদিন সংসদ বহাল ও কার্যকর থাকবে, একজন জনপ্রতিনিধি কেবল ততদিনই এই সরকারি ফ্ল্যাট ব্যবহার করার আইনি বৈধতা রাখেন। সংসদ যখন তার সাংবিধানিক মেয়াদ শেষে বিলুপ্ত হয়ে যায়, তখন আর এক মুহূর্তের জন্যও ওই বাসভবনে অবস্থান করার কোনো নৈতিক, আইনি বা বৈধ অধিকার কারও থাকে না।

 

মেয়াদ শেষে তা নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রের কাছেই ছেড়ে দিতে হয়। অথচ এই অত্যন্ত স্বাভাবিক, আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে অযথা রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য জল ঘোলা করা হচ্ছে বলে তিনি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

 

পরিশেষে, বাজেট-পরবর্তী এই মতবিনিময় সভায় ডা. শফিকুর রহমান তার দলের রাজনৈতিক স্বচ্ছতা, সততা এবং জবাবদিহির বিষয়টি পুনরায় জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি দেশের জনগণকে আশ্বস্ত করেন যে, তারা নির্বাচনী প্রচারণার সময় জনগণের কাছে যেসব কথা বলেছিলেন, তা অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল এবং এর মধ্যে কোনো ধরনের লুকোচুরি, অস্পষ্টতা বা দ্বৈত অর্থ ছিল না।

 

জনপ্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার না করে জনগণের প্রকৃত সেবক হিসেবে কাজ করার যে দৃঢ় অঙ্গীকার তারা ব্যক্ত করেছিলেন, বর্তমান সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসেও তারা সেই আদর্শ ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ ধরে রাখতে সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর।

 

তার এই ভারসাম্যপূর্ণ ও বস্তুনিষ্ঠ বক্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে জনপ্রতিনিধিদের নৈতিক দায়বদ্ধতা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।