শনিবার, ৪ জুলাই রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলন’-এ প্রধান অতিথির আসন থেকে দেওয়া এক সুদীর্ঘ ও দিকনির্দেশনামূলক ভাষণে তিনি এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী ঘোষণা প্রদান করেন।
দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং অতীত সরকারের নানা অনিয়ম ও নিপীড়নের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তার এই সুস্পষ্ট বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সম্মেলনে উপস্থিত বিপুলসংখ্যক শ্রোতা, শহীদ পরিবারের সদস্য ও গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, একটি গণতান্ত্রিক ও আইনের শাসনে বিশ্বাসী রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনার বিন্দুমাত্র কোনো সুযোগ নেই।
বিগত সময়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে এবং ক্ষমতার বাইরে গিয়ে পতিত স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী দেশের নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর যে বর্বরোচিত, অমানবিক ও পৈশাচিক নিপীড়ন চালিয়েছে, তার প্রতিটি ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও আন্তর্জাতিক মানের বিচার নিশ্চিত করতে বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার সম্পূর্ণভাবে বদ্ধপরিকর।
তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে উল্লেখ করেন যে, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল হিসেবে কেবল নিষিদ্ধ করেই সরকার তার আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব শেষ করবে না; বরং তাদের দীর্ঘ শাসনামলে সংঘটিত প্রতিটি বেআইনি, অগণতান্ত্রিক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ আইনি তদন্ত শেষে দলটিকে খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।
দেশের প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত আইনি কাঠামোর আওতায় সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত প্রক্রিয়ায় এই বিচারকার্য সম্পন্ন করা হবে বলেও তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করার সাহস না পায়।
দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি, শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতার বর্তমান চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ পতিত স্বৈরাচারী শক্তির চলমান দেশবিরোধী চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের বিষয়েও দেশবাসীকে অত্যন্ত সতর্ক থাকার উদাত্ত আহ্বান জানান।
তিনি গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত ও দেশত্যাগে বাধ্য হওয়া পতিত স্বৈরাচারী গোষ্ঠীর শীর্ষ নেতারা বর্তমানে বিদেশে পলাতক অবস্থায় অবস্থান করে দেশের নবপ্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক সরকার ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত নানামুখী গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন।
তাদের এই অপতৎপরতার মূল লক্ষ্য হলো যেকোনো মূল্যে দেশের বর্তমান স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্ট করে ঘোলা জলে মাছ শিকার করা বা অনৈতিক ফায়দা লোটা।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সর্বোপরি সচেতন দেশপ্রেমিক জনগণ অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ রয়েছে; সুতরাং দেশের বাইরে বসে রাষ্ট্রবিরোধী কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র বা অভ্যন্তরে নাশকতা সৃষ্টির অপচেষ্টা কখনোই সফল হতে দেওয়া হবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই নীতি নির্ধারণী ভাষণের অন্যতম প্রধান ও অত্যন্ত সংবেদনশীল অংশ জুড়ে ছিল সদ্যসমাপ্ত ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অসীম চেতনা ও অগণিত শহীদদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রসঙ্গ।
জুলাই মাসের সেই রক্তক্ষয়ী গণআন্দোলন এবং অকুতোভয় ছাত্র-জনতার অসামান্য আত্মত্যাগের কথা পরম শ্রদ্ধা ও বিনম্র চিত্তে স্মরণ করে তিনি বলেন, জুলাইয়ের এই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি গতানুগতিক সরকার পরিবর্তনের সাধারণ ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল দীর্ঘদিনের বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক, মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সত্যিকারের গণতান্ত্রিক একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের এক অবিনাশী স্বপ্ন।
তাই জুলাইয়ের সেই পবিত্র স্বপ্ন ও অম্লান চেতনাকে আমাদের সবার হৃদয়ে গভীরভাবে ধারণ করে সম্পূর্ণ ঐক্যবদ্ধভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, তরুণ প্রজন্মের সেই নিঃস্বার্থ ত্যাগের চেতনাকে সঠিকভাবে রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি স্তরে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কেবল বাংলাদেশ তার দীর্ঘদিনের কাঙ্ক্ষিত ও চূড়ান্ত উন্নয়নের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম হবে।
ভাষণের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মহান চেতনাকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের ব্যক্তিকেন্দ্রিক বা স্বার্থান্বেষী তৎপরতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে বলেন, পবিত্র ‘জুলাই চেতনা’ নিয়ে কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক ফায়দা লোটার হীন মানসিকতা কোনোভাবেই রাষ্ট্র বা সমাজ বরদাশত করবে না।
অতীত ইতিহাসের তিক্ত শিক্ষাকে সামনে রেখে তিনি সতর্ক করেন যে, কোনো মহৎ ও পবিত্র চেতনারই বাণিজ্যিকীকরণ বা সংকীর্ণ রাজনৈতিক ব্যবহার কখনোই দেশ ও জাতির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনে না। তাই জুলাইয়ের এই অসামান্য ত্যাগ, রক্ত ও চেতনাকে সব ধরনের সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতি ও ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে।
তিনি এই আত্মত্যাগের চেতনাকে পুঁজি করে কোনো ধরনের ব্যবসায়িক, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের হীন অপচেষ্টা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অত্যন্ত জোরালো আহ্বান জানান এবং এই মহান চেতনাকে শুধুমাত্র দেশ, সমাজ ও মানুষের সার্বিক কল্যাণে নিবেদিত করার উদাত্ত অনুরোধ করেন।