ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে রাজধানীর দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় এই ঘোষণা প্রদান করেন দলের আহ্বায়ক এবং জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ঢাকার রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের আগমনী বার্তা আরও স্পষ্ট হলো।
রাজধানী ঢাকা দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র হওয়ায় এর সিটি নির্বাচন সব সময়ই জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। আধুনিক, বাসযোগ্য ও পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ার যে দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশা নগরবাসীর রয়েছে, তা বাস্তবায়নে তরুণ ও যোগ্য নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই।
মতবিনিময় সভায় নাহিদ ইসলাম তাঁর বক্তব্যে এই বিষয়টির ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করেন। তিনি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন প্রতিটি ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলরদের সঙ্গে দীর্ঘ ও গঠনমূলক আলোচনা করেন।
তিনি সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন যে, প্রতিটি ওয়ার্ডের তৃণমূল পর্যায় থেকে এমন সৎ, যোগ্য ও জনবান্ধব সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী অন্বেষণ করতে হবে, যারা নাগরিকদের প্রাত্যহিক সমস্যাগুলো আন্তরিকতার সঙ্গে অনুধাবন ও সমাধান করতে সক্ষম হবেন।
ওয়ার্ডভিত্তিক নাগরিক সমস্যাগুলো, যেমন-যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নাগরিক নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোকে আগামী দিনের রাজনৈতিক কর্মসূচির মূল কেন্দ্রে রাখার নির্দেশ দেন তিনি।
চলমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জুলাই মাসের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গটি এনসিপির এই মতবিনিময় সভায় অত্যন্ত আবেগময় ও গুরত্বপূর্ণ স্থান দখল করে। বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম দলীয় নেতাকর্মী ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রতি অত্যন্ত আবেগপূর্ণ অথচ কঠোর নির্দেশনা প্রদান করে বলেন, জুলাইয়ের ঐতিহাসিক আন্দোলনে যে সকল বীর শহীদ দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করেছেন এবং যারা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন, তাদের পরিবারগুলোর সঙ্গে সার্বক্ষণিক ও নিবিড় যোগাযোগ বজায় রাখতে হবে।
এই শহীদ পরিবারগুলোর আত্মত্যাগের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করা দলীয় প্রতিটি সদস্যের নৈতিক দায়িত্ব বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। একই সঙ্গে দেশের বর্তমান স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে তিনি একটি সতর্কতামূলক নির্দেশ প্রদান করেন।
তিনি জানান, গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত ও পলায়নপর পতিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যেন কোনোভাবেই জনসমাজে অস্থিরতা বা নাশকতামূলক তৎপরতা চালাতে না পারে, সে বিষয়ে দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সর্বোচ্চ সজাগ ও কড়া নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।
রাজধানীর দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় একটি অত্যন্ত উৎসবমুখর অথচ সুশৃঙ্খল পরিবেশ বিরাজ করছিল। সভায় আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এনসিপির সমর্থনপুষ্ট ও সদ্য ঘোষিত দুই মেয়র প্রার্থী-নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া উপস্থিত থেকে দলীয় প্রধানের দিকনির্দেশনা অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং নগরবাসীর কল্যাণে নিজেদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
এছাড়াও এই রাজনৈতিক সভায় উপস্থিত ছিলেন এনসিপি ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক ও দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক ইসহাক সরকারসহ উত্তর ও দক্ষিণ মহানগরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি সাংগঠনিকভাবে প্রস্তুত।
বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তরুণ প্রার্থীদের নাম ঘোষণা দেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে ঢাকাকে একটি আন্তর্জাতিক মানের মেগাসিটিতে রূপান্তরিত করার যে গুরুদায়িত্ব ভবিষ্যৎ জনপ্রতিনিধিদের কাঁধে বর্তাবে, তা পালনে এই প্রার্থীরা কতটুকু সক্ষম হবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তবে শীর্ষ নেতৃত্বের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা এবং তৃণমূলের সঙ্গে নিবিড় জনসংযোগের যে কৌশল এনসিপি গ্রহণ করেছে, তা আসন্ন নির্বাচনে একটি প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক পরিবেশের সৃষ্টি করবে। নগরবাসী এখন কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং বাস্তবসম্মত ও দৃশ্যমান উন্নয়নের অপেক্ষায় রয়েছেন।