উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান সারির নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিরোধী দলগুলোর দাবি এবং ভবিষ্যৎ আন্দোলনের রূপরেখা নিয়ে অত্যন্ত কড়া ও সুনির্দিষ্ট বার্তা প্রদান করেছেন।
তিনি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে হতাশাগ্রস্ত হয়ে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত না নেওয়ার এবং অবিলম্বে জনগণের যৌক্তিক দাবিগুলো মেনে নেওয়ার তীব্র আহ্বান জানান। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় ঐক্যের প্রথম দফার লংমার্চ কর্মসূচির সফলতার প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান তাঁর বক্তব্য শুরু করেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রথম দফার এই কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং অভাবনীয় সাফল্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট মহলের ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।
তাঁর ভাষায়, এই সফলতায় অনেকেরই মাথা গরম হয়ে গিয়েছে এবং গত কয়েকদিন ধরে রাজধানী ঢাকায় সেই অস্থিরতা বা মাথা গরমের বেশ কিছু সুস্পষ্ট লক্ষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে। একটি পেশাদার ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক দল হিসেবে তারা এই পরিস্থিতির প্রতি গভীর নজর রাখছেন বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।
তিনি সংশ্লিষ্টদের প্রতি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, হতাশা থেকে যেন কেউ মাথা গরম না করেন, বরং উদ্ভূত পরিস্থিতিকে অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে মূল্যায়ন করে জনতার দাবি মেনে নেওয়ার মানসিকতা প্রদর্শন করেন।
দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বর্তমানে বিরোধী জোট আট দফা দাবি নিয়ে মাঠে রয়েছে। তবে এই দাবি যে কোনো সময় পরিবর্তিত রূপ নিতে পারে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা।
তিনি রাজনৈতিক সমীকরণ ব্যাখ্যার মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দেন যে, বর্তমানের এই আট দফা দাবি পরিস্থিতির প্রয়োজনে যেকোনো মুহূর্তে নয় দফা বা দশ দফায় উন্নীত হতে পারে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এবং রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায় এই দাবিগুলো একীভূত হয়ে যেকোনো সময় চূড়ান্ত এক দফা দাবিতে পরিণত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক দফা দাবির অর্থ হলো শাসনযন্ত্রের চূড়ান্ত পতন অথবা রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তন। যদি চলমান আন্দোলন সত্যিই এক দফা দাবিতে রূপান্তরিত হয়, তবে দেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে বলে তিনি গভীরভাবে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
একটি সংঘাতময় ও অস্থিতিশীল ভবিষ্যতের দিকে দেশ যেন না যায়, সেজন্য তিনি নীতিনির্ধারকদের সাম্প্রতিক অতীত থেকে শিক্ষা গ্রহণের পরামর্শ দেন। ইতিহাসের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সময় থাকতে জনগণের দাবি মেনে নেওয়াই হবে সবচেয়ে দূরদর্শী সিদ্ধান্ত।
অন্যথায়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। জনগণের অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে কোনো ধরনের রাজনৈতিক চক্রান্ত বা ষড়যন্ত্র সফল হবে না বলেও তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি দাবি মানতে ব্যর্থ হওয়া যায়, তবে কোনো গোপন চক্রান্ত দিয়ে এই গণজাগরণকে দমন করা সম্ভব হবে না।
নিজেদের আন্দোলনের ভিত্তি ও শক্তির জায়গা স্পষ্ট করে তিনি জানান, তারা কোনো সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ বা ক্ষমতা দখলের দাবি নিয়ে রাজপথে নামেননি। বরং, দেশের ১৮ কোটি সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবং তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্যই এই বৃহত্তর ঐক্যের সূচনা হয়েছে। তাই কোনো বাধা বা ভয়ভীতিকেই তারা আর পরোয়া করবেন না।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি ১১ দলীয় জোটের প্রতি দেশের আপামর জনসাধারণের অকুণ্ঠ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে দাবি করেন যে, আজকের দিনে বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ সম্পূর্ণভাবে ১১ দলের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে এবং তাদের প্রতি অবিচল আস্থা স্থাপন করেছে।
এই বিপুল জনসমর্থনকে পুঁজি করে তারা যে চূড়ান্ত লড়াই শুরু করেছেন, তা সফল না হওয়া পর্যন্ত কেউ পিছু হটবে না। সমাবেশ থেকে সাধারণ জনগণকে আশ্বস্ত করে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অধিকার আদায়ের এই যে নতুন লড়াই শুরু হয়েছে, তা একটি কাঙ্ক্ষিত পরিণতিতে পৌঁছাবেই।
জনগণের সব ধরনের দাবি সম্পূর্ণভাবে আদায় করেই তারা ঘরে ফিরবেন বলে তিনি দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখী এই লংমার্চ কেবল একটি সাধারণ কর্মসূচি নয়, বরং এটি দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে বিরোধীদের রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।
১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা মনে করছেন, রাজধানী ঢাকার বাইরের জনপদগুলোকে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমেই একটি সর্বাত্মক গণআন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব। ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যেও সেই কৌশলের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটেছে।
আগামী দিনগুলোতে এই রাজনৈতিক অচলাবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় এবং সরকার ও বিরোধী জোটের মধ্যে সৃষ্ট এই প্রবল উত্তেজনা কীভাবে প্রশমিত হয়, তা দেখার জন্য দেশবাসী গভীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে।