মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩, ২০২৬
১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্যর্থতা ঢাকতে বিরোধীদের ওপর দমনপীড়ন, জামায়াত আমিরের কঠোর হুঁশিয়ারি

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ০৩:০৭ পিএম

ব্যর্থতা ঢাকতে বিরোধীদের ওপর দমনপীড়ন, জামায়াত আমিরের কঠোর হুঁশিয়ারি
ছবি : Collected

বাংলাদেশের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যকার উত্তেজনা ক্রমশ এক নতুন এবং উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে। দেশের সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা, পাহাড়সম প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং অর্থনৈতিক অদক্ষতা আড়াল করার সুকৌশলী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সরকার এখন পরিকল্পিতভাবে বিরোধী দলকে অপপ্রচারের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

 

তিনি বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারকে অত্যন্ত কঠোর ও স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি প্রদান করে বলেছেন যে, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য তারা যে বিপজ্জনক কৌশল অবলম্বন করছে এবং যে অশুভ শক্তিকে লালন করছে, তা অচিরেই তাদের জন্য চরম বুমেরাং হতে পারে।

 

একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক রূপক ব্যবহার করে তিনি বলেন, যে সাপকে এখন নাচানো হচ্ছে, সেই সাপই একদিন ছোবল দেবে এবং ছোবল দিয়ে সাপটি পালিয়ে গেলেও তার ভয়াবহ বিষক্রিয়ায় রাজনৈতিক মৃত্যু অনিবার্য হয়ে পড়বে।

 

মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে, সদ্য কারামুক্ত দেশের প্রখ্যাত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) আখতারুজ্জামানের সঙ্গে এক বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎ শেষে সংবাদমাধ্যমের কাছে তিনি এসব কথা বলেন।

 

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনে সুবিধাবাদীদের ভূমিকা এবং ক্ষমতার পালাবদলের ইতিহাস নিয়েও তিনি অত্যন্ত সুনিপুণ ও তীক্ষ্ণ সমালোচনা করেন। সরকারের বর্তমান মিত্র এবং সুবিধাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে 'বসন্তের কোকিল' হিসেবে আখ্যায়িত করে জামায়াত আমির বলেন, যারা কেবল ক্ষমতার সুসময়ে সরকারের চারপাশ ঘিরে রেখেছে এবং নিজেদের স্বার্থ হাসিল করছে, দুঃসময় বা সামান্য প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি হলে তাদের কাউকেই আর পাশে পাওয়া যাবে না।

 

তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞার সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে ইঙ্গিত করে স্মরণ করিয়ে দেন যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময়, যাকে তিনি রূপক অর্থে গ্রীষ্মকাল বা বর্ষাকালের মতো কঠিন ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি বলে উল্লেখ করেছেন, তখন এই সুবিধাবাদীরা সরকারকে সম্পূর্ণ একা ও অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে সবার আগে পালিয়ে যাবে।

 

ডা. শফিকুর রহমান সরকারকে উদ্দেশ্য করে অত্যন্ত গঠনমূলক অথচ দৃঢ় বার্তা দেন যে, বিরোধী দলের চরিত্রহনন এবং নিজেদের সমস্ত দোষ তাদের ওপর চাপানোর এই অপকৌশল পরিহার করে সরকারের উচিত নিজেদের চরম ব্যর্থতাগুলোর প্রকৃত সমাধানের পথ খোঁজা।

 

তিনি বিশ্বাস করেন, সরকার যদি অহমিকা পরিহার করে আন্তরিকভাবে সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করতে পারে, তবেই জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের সমর্থন জানাবে। অন্যথায়, অতীতের স্বৈরাচারী সরকারগুলোর মতো গায়ের জোরে প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়ার যেকোনো অপচেষ্টা এদেশের স্বাধীনতাকামী ও মুক্তিকামী জনতা কঠোরভাবে প্রতিহত করবে।

 

বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ কখনোই ফ্যাসিবাদের কাছে মাথা নত করবে না বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, অন্যায়, অবিচার এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে দেশের সংঘবদ্ধ জনতা ইতোমধ্যে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই গণপ্রতিরোধের মাত্রা ও গতি জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাবে।

 

একটি চূড়ান্ত ও অনিবার্য পর্যায়ে গিয়ে এই চলমান রাজনৈতিক সংকটের একটি স্থায়ী, ন্যায়সঙ্গত ও পূর্ণাঙ্গ সমাধান অর্জিত হবে বলে তিনি গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ভোটাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিয়ে তিনি বলেন, পেশিশক্তি ও রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার দিন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে।

 

দেশের আপামর জনসাধারণের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক অধিকার যতদিন পর্যন্ত তাদের নিজেদের হাতে সম্পূর্ণভাবে ফিরে না আসবে, ততদিন পর্যন্ত এই ন্যায়সঙ্গত লড়াই ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম রাজপথে অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেন।

 

এই বিশেষ সাক্ষাৎকালে ডা. শফিকুর রহমান দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দীর্ঘস্থায়ী যাত্রী হয়রানি রোধে মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) আখতারুজ্জামানের সাম্প্রতিক সাহসী ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন।

 

তিনি বলেন, একজন অত্যন্ত সচেতন নাগরিক ও রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মেজর আখতারুজ্জামানের একাকী ও নিঃস্বার্থ প্রতিবাদের ফলে দেশের প্রধান বিমানবন্দরে যুগ যুগ ধরে চলে আসা পুঞ্জীভূত অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।

 

বিশেষ করে রেমিট্যান্স যোদ্ধা হিসেবে পরিচিত প্রবাসী কর্মী এবং সাধারণ যাত্রীদের মৌলিক অধিকার আদায়ে তার এই প্রতিবাদ শতভাগ কার্যকর ও যুগান্তকারী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। জামায়াত আমির অত্যন্ত বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেন যে, বিমানবন্দরে চরম মাত্রায় ট্রলি সংকট, লাগেজ চুরি হওয়া এবং যাত্রীদের ব্যাগ কেটে মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেওয়ার মতো জঘন্য ও সংঘবদ্ধ অপরাধগুলো দীর্ঘকাল ধরে সেখানকার একটি অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল।

 

কিন্তু আখতারুজ্জামানের বলিষ্ঠ, আপসহীন ও সাহসী পদক্ষেপের পর বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছে নানামুখী সংস্কারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে। ফলস্বরূপ, ইতিমধ্যেই যাত্রীদের সুবিধার্থে দুই দফায় বিমানবন্দরে তিন শতাধিক নতুন ট্রলি সংযুক্ত করা হয়েছে।

 

পাশাপাশি, লাগেজ চুরির মতো অপরাধ ঠেকাতে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত সব কর্মীর শরীরে বাধ্যতামূলকভাবে বডি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে বর্তমানে যাত্রীরা বিমান থেকে নামার মাত্র পনেরো থেকে বিশ মিনিটের মধ্যেই তাদের কাঙ্ক্ষিত লাগেজ হাতে পাচ্ছেন, যা যুগ যুগ ধরে অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হওয়া বিশেষ করে প্রবাসী ভাইবোনদের জন্য এক বিশাল স্বস্তি ও আনন্দের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

তবে সমাজের জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও কল্যাণকর পরিবর্তনের সূচনা করার পরও মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) আখতারুজ্জামানকে যে ধরনের ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় নিগ্রহ ও হয়রানির শিকার হতে হয়েছে, তা নিয়ে ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে গভীর ক্ষোভ, হতাশা ও তীব্র নিন্দা ব্যক্ত করেন।

 

তিনি জানান, সরকারি কাজে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাধা প্রদান এবং অন্যায়ভাবে সরকারি কর্মকর্তার ওপর হামলার মতো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও হাস্যকর অভিযোগ এনে এই প্রবীণ বীর মুক্তিযোদ্ধার বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

 

সেদিনের প্রকৃত ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নিজেদের মুখ রক্ষা করতে কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে তাদের দুই কর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করেছিল। যদি সেই কর্মীদের কোনো অপরাধ না-ই থাকত, তবে কেন তাদের বরখাস্ত করা হলো, সেই অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্নও তিনি উত্থাপন করেন।

 

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, তার সহকর্মী সেদিন কারও গায়ে হাত তোলেননি; বরং সাধারণ মানুষের অধিকারের কথা বলতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন। একজন সম্মানিত প্রবীণ নাগরিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনাকে তিনি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য চরম লজ্জাজনক ও কলঙ্কজনক অধ্যায় বলে আখ্যায়িত করেন।

 

একটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন মামলায় নিম্ন আদালত থেকে তাকে জামিন না দেওয়া, অত্যন্ত অমানবিক কায়দাতে চোখে কালো কাপড় বাঁধা, মাথায় হেলমেট ও বুকে সুরক্ষামূলক ভেস্ট পরিয়ে দুর্ধর্ষ আসামির মতো আদালতে উপস্থাপন করার মতো ঘটনাগুলো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রযন্ত্র বর্তমানে সাধারণ নাগরিকদের প্রতিবাদের মুখে কতটা ভয় ও শঙ্কার মধ্যে দিনাতিপাত করছে।

 

উচ্চ আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পরও তাকে কাপুরুষোচিতভাবে চেম্বার জজ আদালতে টেনে নেওয়ার দীর্ঘস্থায়ী আইনি হয়রানির প্রক্রিয়াটিকে তিনি বিচার ব্যবস্থার চরম অবক্ষয় এবং ঘাটে ঘাটে লজ্জার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বর্ণনা করেন।

 

সরকারের এই ধরনের নির্লজ্জ ও অগণতান্ত্রিক আচরণের কঠোর সমালোচনা করে তিনি একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দার্শনিক উপমা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, যার গায়ে কোনো বস্ত্র নেই, তাকে দেখে সভ্য ও সম্ভ্রমশীল মানুষই বরং লজ্জা পায়, কিন্তু ওই বস্ত্রহীন নির্লজ্জ ব্যক্তির নিজের মধ্যে কোনো অপরাধবোধ বা লজ্জা কাজ করে না।

 

বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থাও ঠিক সেরকমই এক দেউলিয়াত্বের পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নৈতিকতার এই চরম অবক্ষয় কবে দূর হবে, লজ্জা কি চিরকাল নির্বাসনেই থাকবে, নাকি কবে এই নির্লজ্জতার অবসান ঘটে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে তিনি সমগ্র জাতির কাছে একটি উন্মুক্ত প্রশ্ন রাখেন।

 

পরিশেষে, ডা. শফিকুর রহমান তার রাজনৈতিক সহকর্মী মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) আখতারুজ্জামানের অদম্য সাহসিকতাকে সমগ্র দেশবাসীর জন্য একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন যে, তারা জনগণের অধিকার আদায়ের প্রশ্নে কোনো রক্তচক্ষু বা রাষ্ট্রীয় ভয়ভীতিকে বিন্দুমাত্র পরোয়া করেন না।

 

ন্যায়বিচার, মানবাধিকার এবং হারানো গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের এই নিরন্তর ও দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে দেশের প্রতিটি দেশপ্রেমিক নাগরিক ঠিক একইভাবে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে রাজপথে নেমে আসবে বলে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।