মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬
১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নাইজেরিয়ায় সন্ত্রাসীদের বর্বরোচিত হামলায় শিশুসহ অন্তত ৩০ জন নিহত!

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই, ২০২৬, ০৭:১৬ পিএম

নাইজেরিয়ায় সন্ত্রাসীদের বর্বরোচিত হামলায় শিশুসহ অন্তত ৩০ জন নিহত!
ছবি : Collected

পশ্চিম আফ্রিকার জনবহুল দেশ নাইজেরিয়ায় আবারও এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় কাডুনা রাজ্যের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে অতর্কিত এই সশস্ত্র হামলায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ৩০ জন নিরীহ গ্রামবাসী নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন।

 

সোমবার ভোরের আলো ফোটার আগেই, যখন চারদিক রাতের নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই একদল সশস্ত্র বন্দুকধারী ওই গ্রামে প্রবেশ করে এবং ঘুমন্ত মানুষের ওপর বর্বরোচিত কায়দায় নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক বিস্তারিত ও বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদনে স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে এই লোমহর্ষক হত্যাযজ্ঞের কথা নিশ্চিত করা হয়েছে। আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বড় একটি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকটের মধ্য দিয়ে যাওয়া নাইজেরিয়ায় এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা নতুন করে চরম আতঙ্ক ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

 

স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই মর্মান্তিক হামলার বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে প্রাথমিক তথ্য প্রদান করা হয়েছে। ওই হামলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের প্রধানের ব্যক্তিগত সচিব ডোগন রানা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের কাছে ঘটনার ভয়াবহতা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।

 

তিনি অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে জানান যে, কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভারি অস্ত্রে সজ্জিত বন্দুকধারীদের একটি বিশাল দল হঠাৎ করেই তাদের এলাকায় প্রবেশ করে। তারা গ্রামে ঢুকেই চারদিকে নির্বিচারে এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করে এবং সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত ঘরবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।

 

তিনি অত্যন্ত বেদনার সাথে নিশ্চিত করেছেন যে, এই পাশবিক হামলায় নিহতদের মধ্যে অন্তত আটজন নিষ্পাপ শিশু রয়েছে, যারা নিজেদের বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থায় অত্যন্ত নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে।

 

এছাড়া এই হামলায় আরও অন্তত চারজন গ্রামবাসী গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন, যাদের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে এবং তারা বর্তমানে নিবিড় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। প্রশাসনিক সূত্র অনুযায়ী, কাডুনা রাজ্যের কাউরু এলাকার অন্তর্গত নারিডন গ্রামেই মূলত এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়।

 

ওই গ্রামেরই এক স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিশিষ্ট যুবনেতা ইশায়া দাওয়া রয়টার্সের সংবাদকর্মীদের কাছে সেই রাতের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানান, হামলাকারীরা মধ্যরাতের দিকে সম্পূর্ণ সুপরিকল্পিতভাবে নারিডন গ্রামে অনুপ্রবেশ করে এবং ঘুমন্ত ও সাধারণ বাসিন্দাদের লক্ষ্য করে বৃষ্টির মতো প্রাণঘাতী গুলি ছুড়তে থাকে।

 

তার বর্ণনামতে, হামলাকারীদের নিষ্ঠুরতা কেবল দূর থেকে গুলি চালানোর মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তারা অনেকের ঘরে ঢুকে নিরীহ গ্রামবাসীকে অত্যন্ত নির্মমভাবে জবাই করে হত্যা করেছে, যা মানবতার চরম লঙ্ঘন।

 

ইতোমধ্যে নিহতদের বেশ কয়েকজনের ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্ত ও যথাযথ সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। নিহতদের পরিচয় ও বয়স সম্পর্কে ধারণা দিতে গিয়ে এই যুবনেতা জানান যে, ভুক্তভোগীদের মধ্যে নিরীহ নারী, শিশু এবং বয়োবৃদ্ধরা রয়েছেন, যারা শারীরিক দুর্বলতার কারণে নিজেদের আত্মরক্ষার বা পালিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগই পাননি।

 

হামলাকারীরা তাদের হত্যাযজ্ঞ শেষে নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার আগে গ্রামটির একাধিক বসতবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়, যার ফলে পুরো গ্রামটি ভোরের আলো ফোটার আগেই এক জ্বলন্ত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।

 

অন্যদিকে, প্রশাসনের ভূমিকা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা নিয়ে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে। প্রত্যক্ষদর্শী ওই যুবনেতা অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেন, মধ্যরাতে এই ভয়াবহ হামলা শুরু হলেও এবং দীর্ঘ সময় ধরে সশস্ত্র তাণ্ডব চললেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান হামলার কয়েক ঘণ্টা পর, একেবারে সকালের দিকে।

 

ততক্ষণে হামলাকারীরা তাদের ধ্বংসযজ্ঞ শেষ করে নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। তবে কাডুনা রাজ্য পুলিশের পক্ষ থেকে এই মর্মান্তিক ঘটনার একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে।

 

পুলিশের মুখপাত্র মনসুর হাসান গণমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, তারা পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন এবং আলামত সংগ্রহ করছেন। এই হামলার বিষয়ে খুব শিগগিরই একটি বিস্তারিত ও তথ্যবহুল প্রতিবেদন পুলিশের তরফ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে বলে তিনি দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন।

 

নাইজেরিয়ার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই চরম হুমকি ও অস্থিতিশীলতার মুখে রয়েছে। বিশেষ করে দেশটির উত্তর-পশ্চিম এবং উত্তর-মধ্যাঞ্চলে বিভিন্ন সশস্ত্র গ্যাং এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর এ ধরনের প্রাণঘাতী সহিংসতা এক নৈমিত্তিক ও ভয়াবহ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

 

এসব অঞ্চলে প্রায়ই নিরীহ গ্রামবাসীদের ওপর এ ধরনের অতর্কিত হামলা, নির্মম হত্যা, লুটপাট ও মুক্তিপণের দাবিতে অপহরণের মতো ঘটনা ঘটছে, যা সেখানকার লাখ লাখ মানুষের জীবনে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও এক দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট তৈরি করেছে।

 

দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আগে থেকেই উগ্র ইসলামপন্থী জঙ্গিগোষ্ঠী বোকো হারাম এবং ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স বা আইএসডব্লিউএপি-এর মতো দুর্ধর্ষ সংগঠনগুলোর দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাণঘাতী বিদ্রোহের কারণে নাইজেরিয়া সরকার একটি বহুমুখী ও জটিল সংকটের মুখোমুখি।

 

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই গোষ্ঠীগুলো প্রতিনিয়ত ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে কাডুনা রাজ্যের নারিডন গ্রামে সংঘটিত সর্বশেষ এই বর্বরোচিত হামলার দায়ভার এখন পর্যন্ত কোনো সন্ত্রাসী বা সশস্ত্র গোষ্ঠী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো নাইজেরিয়ার এই চরম অবনতিশীল মানবাধিকার ও ক্রমহ্রাসমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বারবার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

 

- রয়টার্স