মঙ্গলবার, জুলাই ২১, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উত্তর মালিতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভয়াবহ অতর্কিত হামলা, নিহত অন্তত ৫০

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০ জুলাই, ২০২৬, ০৭:২৮ পিএম

উত্তর মালিতে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ভয়াবহ অতর্কিত হামলা, নিহত অন্তত ৫০
ছবি: Reuters

পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালির উত্তরাঞ্চলে একটি সেনা বহরে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী ও কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলোর সংঘবদ্ধ ও ভয়াবহ অতর্কিত হামলায় অন্তত ৫০ জন সরকারি সেনা সদস্য নিহত হয়েছেন।

 

কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর আনেফিস থেকে নিজেদের সামরিক অবস্থান প্রত্যাহার করে নিরাপদ আশ্রয়ে ফেরার পথে মালির সরকারি বাহিনীর ওপর এই প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে। মালির সাম্প্রতিক সামরিক ইতিহাসে সরকারি বাহিনীর ওপর পরিচালিত সবচেয়ে বড় ও রক্তক্ষয়ী হামলাগুলোর মধ্যে এটিকে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

রবিবার দেশটির স্থানীয় প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই ভয়াবহ প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করেছে। সাহেল অঞ্চলে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা অস্থিতিশীলতা ও সশস্ত্র সংঘাতের পটভূমিতে এই ঘটনা মালির নিরাপত্তা পরিস্থিতির চরম অবনতিকেই নির্দেশ করে।

 

স্থানীয় প্রশাসন ও সামরিক সূত্রগুলোর দেওয়া তথ্যানুযায়ী, মালির উত্তরাঞ্চলীয় আনেফিস শহরের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা নিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই সরকারি বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের তীব্র ও রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছিল।

 

দীর্ঘ সংঘাতের পর কৌশলগত পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় এবং রসদ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেওয়ায় শনিবার শহরটি ছেড়ে পিছু হঠার সিদ্ধান্ত নেয় মালির সামরিক বাহিনী। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর একটি বড় বহর যখন আনেফিস ত্যাগ করে নিরাপদ ঘাঁটির দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, ঠিক তখনই পথিমধ্যে আগে থেকেই ওত পেতে থাকা তুয়ারেগ বিচ্ছিন্নতাবাদী যোদ্ধা এবং আল-কায়েদার সঙ্গে সম্পৃক্ত জিহাদিরা তাদের ওপর চারদিক থেকে প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়।

 

আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত বিদ্রোহীদের এই অতর্কিত ও চতুর্মুখী হামলায় সেনা বহরটি সম্পূর্ণভাবে দিশেহারা হয়ে পড়ে এবং ব্যাপক প্রাণহানির শিকার হয়। এই রক্তক্ষয়ী হামলার পরপরই মালির উত্তরাঞ্চলে সক্রিয় স্বাধীনতাকামী তুয়ারেগ বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘এফএলএ’ এবং আল-কায়েদার অনুগত কট্টরপন্থি সশস্ত্র সংগঠন ‘জেএনআইএম’ পৃথকভাবে এই প্রাণঘাতী হামলার সম্পূর্ণ দায় স্বীকার করেছে।

 

উল্লেখ্য, চলতি জুলাই মাসের শুরুর দিকে এই দুই সশস্ত্র গোষ্ঠী যৌথভাবে প্রবল আক্রমণ চালিয়ে স্বল্প সময়ের জন্য আনেফিস শহরের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছিল। সে সময় তারা মালির নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং তাদের সামরিক সহায়তাকারী রুশ-সমর্থিত ‘আফ্রিকা কোর’ বাহিনীর ব্যবহৃত একটি কেন্দ্রীয় সামরিক ঘাঁটিও সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলেছিল।

 

মালির বর্তমান সামরিক জান্তা সরকারের ঘনিষ্ঠ একজন স্থানীয় পদস্থ কর্মকর্তা ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, শনিবারের ওই সংঘবদ্ধ হামলায় ৫০ জনেরও বেশি সেনা সদস্য মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন এবং সশস্ত্র বিদ্রোহীদের হাতে অন্তত ২৪ জন সেনা সদস্য যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক হয়েছেন, যাদের চরম অনিশ্চিত ভাগ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

 

মালির সামরিক বাহিনীর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে যে, এই হামলায় সেনা সদস্যদের অত্যন্ত সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু করে হত্যা করা হয়েছে।

 

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নিরাপদে পিছু হঠার সময় একটি সুসজ্জিত সামরিক বহর কীভাবে এতটা অরক্ষিত ও দুর্বল অবস্থায় পড়ল, যাত্রাপথে তাদের নিরাপত্তায় কেন পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল না এবং গোয়েন্দা নজরদারিতে কোনো বড় ধরনের ঘাটতি ছিল কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে এরই মধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।

 

তবে মালির সেনাবাহিনী শনিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তাদের বহর অতর্কিত হামলার মুখে পড়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সামরিক বাহিনীর মনোবল অটুট রাখার স্বার্থে ঠিক কতজন সেনা সদস্য হতাহত হয়েছেন, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান প্রকাশ করা থেকে বিরত থেকেছে।

 

এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে বিদেশি যোদ্ধাদের সম্পৃক্ততার বিষয়েও বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রাপ্ত সূত্রমতে, মালির সেনাবাহিনীকে কৌশলগত ও সামরিক সহায়তা প্রদানকারী রুশ আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা এই ভয়াবহ হামলার ঠিক আগেই আনেফিস থেকে সফলভাবে সরে গিয়ে পাশ্ববর্তী গাও শহরে পৌঁছে গিয়েছিলেন।

 

যার ফলে বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর এই অতর্কিত হামলায় রুশ বাহিনীর কোনো সদস্যের প্রাণহানি বা কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। গাও অঞ্চলের একজন শীর্ষস্থানীয় কমিউনিটি নেতাও সংবাদমাধ্যমের কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, নিহতদের লাশগুলো শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে কোনো রুশ নাগরিক নেই; হামলায় নিহতরা সবাই মালির নিয়মিত সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত স্থানীয় মিলিশিয়া বাহিনীর সদস্য।

 

এই মর্মান্তিক ঘটনা মালির বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের ভয়াবহতাকে নতুন করে সমগ্র বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছে। ২০২০ এবং ২০২১ সালে পরপর দুটি রক্তক্ষয়ী সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে মালি বর্তমানে সরাসরি সামরিক জান্তা সরকারের কঠোর শাসনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে।

 

ক্ষমতা গ্রহণের পর সামরিক সরকার দেশের সার্বিক নিরাপত্তা পুনরুদ্ধার এবং উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘদিনের জিহাদি ও বিচ্ছিন্নতাবাদী সহিংসতা কঠোর হাতে দমনের জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সাহেল অঞ্চলের এই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে এখনো কাঙ্ক্ষিত শান্তি ফেরানো সম্ভব হয়নি।

 

বরং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর এই ধরনের সুপরিকল্পিত, বেপরোয়া ও প্রাণঘাতী হামলা বারবার প্রমাণ করছে যে, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থিতিশীল করতে এবং রাষ্ট্রের সার্বিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে মালির সামরিক জান্তা সরকার এখনো পাহাড়সম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি অবস্থান করছে।