রবিবার, জুলাই ১৯, ২০২৬
৩ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আলজেরিয়ার শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, শিশুসহ ১১ জনের প্রাণহানি

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ জুলাই, ২০২৬, ০৯:৪৭ পিএম

আলজেরিয়ার শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, শিশুসহ ১১ জনের প্রাণহানি
ছবি : Collected

উত্তর আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়ার রাজধানী আলজিয়ার্সে একটি রাষ্ট্রীয় শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে ঘটে যাওয়া এক ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় শিশুসহ অন্তত ১১ জনের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটেছে। এই অকল্পনীয় ও শোকাবহ দুর্ঘটনায় আরও ১৯ জন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই বেশ আশঙ্কাজনক।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সূত্রমতে, রাজধানী আলজিয়ার্সের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মোহাম্মাদিয়া এলাকায় গত বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই দিবাগত রাত আনুমানিক ভোর সাড়ে তিনটার দিকে এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়।

 

গভীর রাতে যখন চারদিক নিস্তব্ধ এবং কেন্দ্রের আবাসিক শিশু ও কর্মীরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখনই 'চাইল্ডহুড রিলিফ ইনস্টিটিউশন' নামের ওই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে আকস্মিকভাবে এই ধ্বংসাত্মক আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে।

 

মর্মান্তিক এই প্রাণহানির ঘটনা পুরো আলজেরিয়াজুড়ে গভীর শোক ও বিষাদের ছায়া নামিয়ে এনেছে। মোহাম্মাদিয়া এলাকায় অবস্থিত এই শিশু কল্যাণ কেন্দ্রটি মূলত সমাজের সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া ও অসহায় শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হয়ে আসছিল।

 

প্রতিষ্ঠানটি মূলত এতিম, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া পরিত্যক্ত শিশু এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের সার্বিক আশ্রয়, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সামাজিক সহায়তা প্রদানের মতো মহৎ কাজে নিয়োজিত ছিল।

 

যাদের পৃথিবীতে মাথা গোঁজার নিজস্ব কোনো নিরাপদ জায়গা ছিল না, এই রাষ্ট্রীয় ভবনটিই ছিল তাদের একমাত্র ভরসার জায়গা। কিন্তু আকস্মিক এই অগ্নিকাণ্ড সেই নিরাপদ আশ্রয়স্থলটিকে মুহূর্তের মধ্যেই এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত করে।

 

নিরীহ ও অসহায় শিশুদের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম হতাশা ও গভীর শোকের সৃষ্টি হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আলজেরিয়ার সিভিল প্রোটেকশন সংস্থা বা ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের একাধিক চৌকস উদ্ধারকারী দল অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে যায়।

 

দেশটির সিভিল প্রোটেকশন সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, উদ্ধারকর্মীরা যখন অকুস্থলে পৌঁছান, তখন ভবনটির ভেতরে প্রচুর ঘন কালো ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উড়ছিল এবং অক্সিজেনের চরম সংকট দেখা দিয়েছিল।

 

জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই ঘন ধোঁয়া ও আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যেই উদ্ধারকারীরা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং আটকে পড়া বেশ কয়েকজনকে জীবিত অবস্থায় বের করে আনতে সক্ষম হন।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, দুর্ঘটনাস্থলের বাইরে স্থানীয় শত শত মানুষ গভীর উৎকণ্ঠা নিয়ে ভিড় করে আছেন এবং উদ্ধারকর্মীদের শ্বাসরুদ্ধকর তৎপরতা প্রত্যক্ষ করছেন।

 

সিভিল প্রোটেকশনের প্রকাশিত ছবিগুলোতেও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন করিডোরের ভেতর দিয়ে উদ্ধারকারীদের আগুন নিয়ন্ত্রণের আপ্রাণ চেষ্টা ও বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।

 

উদ্ধার অভিযানের পর আহতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। চিকিৎসা কর্তৃপক্ষের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ১০ জনকে বিভিন্ন মাত্রায় দগ্ধ অবস্থায় বিশেষায়িত বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

 

এছাড়া, ঘন কালো ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছেন এমন দুজনকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এই ভয়াবহ ঘটনার ভয়াল রূপ দেখে মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত বা ট্রমাটাইজড হয়ে পড়া আরও সাতজনকে হাসপাতালে বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং দেওয়া হচ্ছে।

 

তবে অত্যন্ত স্বস্তির বিষয় হলো, উদ্ধারকর্মীদের তাৎক্ষণিক ও সাহসী তৎপরতার কারণে অন্তত পাঁচজন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদ অবস্থায় উদ্ধার করে অন্য একটি নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে।

 

এই অভাবনীয় ও মর্মান্তিক মানবিক বিপর্যয়ে আলজেরিয়ার রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গভীর শোক ও সমবেদনা জ্ঞাপন করা হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদেলমাদজিদ তিব্বুন এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় গভীরভাবে শোকাহত হয়েছেন।

 

তিনি এক বিশেষ শোকবার্তায় নিহতদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি তার গভীর সমবেদনা ও সহানুভূতি জানিয়েছেন এবং যারা আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন, তাদের দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা কামনা করেছেন।

 

একই সঙ্গে পরিস্থিতি অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে এবং আহতদের চিকিৎসা কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করার জন্য আলজেরিয়ার প্রধানমন্ত্রী সিফি ঘিরিব দ্রুততম সময়ের মধ্যে মুস্তফা পাশা ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে ছুটে যান।

 

সেখানে তিনি চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং আহতদের সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন। ইতোমধ্যে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার ও তল্লাশি অভিযান সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়েছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে।

 

তবে ঠিক কী কারণে এত সুরক্ষিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটল, তা উদঘাটন করতে নিরাপত্তা সংস্থা ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

এই তদন্ত কমিটি ভবনের অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক ত্রুটি এবং অন্য কোনো সম্ভাব্য গাফিলতি ছিল কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখবে। এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে রাষ্ট্রের এতিমখানা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করার বিষয়ে এখন দেশজুড়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয়েছে।

 

- আল জাজিরা