শনিবার, জুন ২৭, ২০২৬
১৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফ্রান্সের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করল বুরকিনা ফাসো

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৭ জুন, ২০২৬, ১২:৪২ পিএম

ফ্রান্সের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করল বুরকিনা ফাসো
ছবি : Collected

দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন ও ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার পর অবশেষে সাবেক ঔপনিবেশিক শাসক ফ্রান্সের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার রাষ্ট্র বুরকিনা ফাসো।

 

এই অভাবনীয় ও কঠোর পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে প্যারিস এবং ওয়াগাদুগুর মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের তিক্ততা এক চূড়ান্ত এবং প্রকট আকার ধারণ করল। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, শুক্রবার দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত এক সরকারি বিবৃতির মাধ্যমে এই কূটনৈতিক বিচ্ছেদের বিষয়টি বিশ্ববাসীকে নিশ্চিত করা হয়।

 

রাষ্ট্রীয় ওই বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, বুরকিনা ফাসো সরকার নিজস্ব সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে ফ্রান্সের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বুরকিনা ফাসোর বর্তমান সামরিক সরকার শুরু থেকেই পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি, বিশেষ করে ফ্রান্সের প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছিল।

 

২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আরোহণ করেন ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ত্রাওরে। তার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই প্যারিসের প্রভাব বলয় থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি কঠোর ও আপসহীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে আসছে।

 

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত সরকারি বিবৃতিতে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে অত্যন্ত গুরুতর সব অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, ফ্রান্স ধারাবাহিকভাবে বুরকিনা ফাসোর জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী এবং ক্ষতিকর কার্যকলাপে লিপ্ত রয়েছে, যা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে তাদের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

 

কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের এই প্রেক্ষাপট নিয়ে দেশটির যোগাযোগমন্ত্রী গিলবার্ট ওয়েদ্রাওগো সংবাদমাধ্যমের সামনে সরকারের অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অগাধ বিশ্বাস, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি এবং সর্বোপরি সার্বভৌমত্বের প্রতি যে শ্রদ্ধাশীল মনোভাব থাকা প্রয়োজন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার চরম অনুপস্থিতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।

 

তিনি আরও জানান যে, ফরাসি সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের প্রতিটি দিক গভীরভাবে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের পরই জাতীয় স্বার্থে এমন একটি কঠিন ও যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে তাদের সরকার।

 

ফ্রান্সের বিরুদ্ধে নব্য-ঔপনিবেশিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা লালন করার অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর অভিযোগ এনেছেন বুরকিনা ফাসোর এই জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যেসব সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বুরকিনা ফাসোসহ সমগ্র সাহেল অঞ্চলকে দীর্ঘদিন ধরে এক গভীর শোকের সাগরে ভাসিয়ে দিচ্ছে, ফ্রান্স সেই সব সন্ত্রাসীদের অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে সমর্থন ও মদত দিয়ে যাচ্ছে।

 

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাকে অস্থিতিশীল করার পেছনে বিদেশি শক্তির এমন ইন্ধন বুরকিনা ফাসোর সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। পশ্চিম আফ্রিকার রাজনীতিতে ফ্রান্সের প্রভাব একসময় প্রশ্নতীত থাকলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে এক ব্যাপক ভূ-রাজনৈতিক পটপরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

 

বুরকিনা ফাসোর এই পদক্ষেপ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি সমগ্র সাহেল অঞ্চলে চলমান এক বৃহত্তর পশ্চিমা-বিরোধী মনোভাবেরই সুস্পষ্ট প্রতিফলন। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোও ইতোমধ্যে ফরাসি প্রভাব বলয় থেকে নিজেদের মুক্ত করার পথে হেঁটেছে।

 

বুরকিনা ফাসোর বর্তমান সামরিক জান্তা এই একই পথ অনুসরণ করে জাতীয়তাবাদী চেতনার উন্মেষ ঘটানোর চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আফ্রিকার মাটিতে সাবেক পরাশক্তিগুলোর এমন প্রত্যাখ্যান আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি করছে।

 

এদিকে, বুরকিনা ফাসোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিও অত্যন্ত জটিল এবং উদ্বেগজনক অবস্থায় রয়েছে। উল্লেখ্য, গত জানুয়ারি মাসে বুরকিনা ফাসোর ক্ষমতাসীন সামরিক সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে দেশের সব রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং সেসব দলের সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে।

 

আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক সরকারের এই আকস্মিক পদক্ষেপ পশ্চিম আফ্রিকার এই যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে এক বিরাট এবং অশনিসংকেত স্বরূপ ধাক্কা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ার এই ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

অন্যদিকে, ভৌগোলিক অবস্থানগতভাবে স্থলবেষ্টিত রাষ্ট্র বুরকিনা ফাসো বর্তমানে ভয়াবহ নিরাপত্তা সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে একাধিক ভয়ংকর সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে দেশটির উত্তর, দক্ষিণ এবং পশ্চিমাঞ্চলের এক বিশাল অংশ এসব সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর দখলে রয়েছে।

 

দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় সরকারি বাহিনী এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিরলসভাবে লড়াই করে যাচ্ছে। এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার প্রতি প্রকাশ্য সমর্থনপুষ্ট জামায়াত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন এবং ইসলামিক স্টেট সাহেল প্রভিন্স।

 

চরমপন্থি এসব গোষ্ঠীর অব্যাহত হামলায় দেশটিতে গভীর মানবিক ও নিরাপত্তা সংকট তৈরি হয়েছে, যার অবসান ঘটাতে বর্তমান সরকার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শক্তির বলয় থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব সামরিক কৌশলের ওপর নির্ভর করার চেষ্টা করছে। দেশের সাধারণ মানুষ এখন দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে একটি স্বাধীন ও শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের অপেক্ষায় দিন গুনছে।

 

- আল জাজিরা