বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬
১৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কঙ্গোতে ইবোলা ভাইরাসের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, প্রাণহানি ৪০০ ছাড়াল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০২ জুলাই, ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম

কঙ্গোতে ইবোলা ভাইরাসের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব, প্রাণহানি ৪০০ ছাড়াল
ছবি : Collected

আফ্রিকার মধ্যাঞ্চলীয় রাষ্ট্র ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের এক মারাত্মক প্রাদুর্ভাবে ৪০০ জনেরও বেশি মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বৃহস্পতিবার দেশটির সরকারি স্বাস্থ্য পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে স্বনামধন্য ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এই গভীর উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে।

 

দেশটিতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নানাবিধ সীমাবদ্ধতা এবং ভাইরাসের দ্রুত বিস্তারের কারণে পুরো অঞ্চলজুড়ে এক চরম আতঙ্ক ও মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। কঙ্গোর জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সর্বশেষ প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৫ মে দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে ইবোলার প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করার পর থেকে এখন পর্যন্ত অত্যন্ত সংক্রামক এই ব্যাধিতে অন্তত ১ হাজার ৪০৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

 

এর মধ্যে দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন কমপক্ষে ৪৩৮ জন মানুষ। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর হার বর্তমানে ৩১ শতাংশেরও বেশি। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে এই মৃত্যুর হার আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়তে পারে বলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

 

প্রাদুর্ভাবের মূল কেন্দ্রস্থল থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম প্রধান শহর কিসাঙ্গানিতেও সম্প্রতি প্রথমবারের মতো ইবোলা আক্রান্ত এক রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যা সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও ভয়াবহ করে তুলেছে।

 

জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, ২৪ বছর বয়সী এক মৃত অন্তঃসত্ত্বা নারীর শরীরের নমুনা পরীক্ষা করে ইবোলা ভাইরাসের উপস্থিতি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, ওই নারীর মৃতদেহটি ইতুরি প্রদেশের নিয়া নিয়া স্বাস্থ্য অঞ্চল থেকে একটি মোটরসাইকেলে করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে কিসাঙ্গানিতে নিয়ে আসা হয়েছিল।

 

প্রায় পনেরো লাখ মানুষের বসবাস থাকা শোপো প্রদেশের রাজধানী কিসাঙ্গানিতে এই প্রাণঘাতী ভাইরাসের প্রবেশ সাধারণ জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বিশাল ও অনাকাঙ্ক্ষিত হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে মৃত ব্যক্তির শরীর অত্যন্ত মাত্রায় সংক্রামক থাকে।

 

অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি ও সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা ছাড়া দাফন বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করার সময় এই প্রাণঘাতী জীবাণু নতুন করে শোকার্ত স্বজনদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ার অগণিত নজির রয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, কঙ্গোর বর্তমান এই প্রাদুর্ভাবটি মূলত ইবোলা ভাইরাসের ‘বুন্দিবুগিও’ ধরনের কারণে সৃষ্টি হয়েছে।

 

অত্যন্ত সংক্রামক এবং প্রাণঘাতী এই নির্দিষ্ট ধরনটির বিপরীতে এখন পর্যন্ত কার্যকরী কোনো টিকা বা সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও হতাশাজনক করে তুলেছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য আশার কথা হলো, খুব শিগগিরই এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য সম্ভাব্য কিছু প্রতিষেধকের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

 

বর্তমানে কঙ্গোতে চলমান এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মূল কেন্দ্রস্থল হলো উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশ। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ইবোলায় মোট মৃত্যুর ৮৩ শতাংশেরও বেশি ঘটনা ঘটেছে শুধুমাত্র এই একটি প্রদেশেই।

 

তবে দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন হওয়ায় ইবোলার প্রকৃত ব্যাপকতা এবং ভয়াবহতা নিরূপণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা অকপটে স্বীকার করেছেন।

 

এই ইতুরি প্রদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্র উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের সরাসরি সীমান্ত রয়েছে, যা আন্তঃসীমান্ত সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইতোমধ্যে ইবোলা ভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাব পার্শ্ববর্তী উত্তর কিভু এবং দক্ষিণ কিভু প্রদেশগুলোতেও অত্যন্ত মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

 

বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসটি ‘অর্থোইবোলাভাইরাস জাইরেন্স’ নামে পরিচিত। গবেষকরা এ পর্যন্ত ইবোলা ভাইরাসের মোট ছয়টি আলাদা প্রজাতি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন। এগুলো হলো-জাইর, সুদান, বুন্দিবুগিও, রেস্টন, তাই ফরেস্ট এবং বোম্বালি।

 

২০১৪ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণের জন্য মূলত ‘জাইর’ প্রজাতিটি সরাসরি দায়ী থাকলেও, বর্তমানে কঙ্গো এবং উগান্ডায় যে প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে ‘বুন্দিবুগিও’ প্রজাতিটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।

 

ইবোলা ভাইরাসের প্রধান শিকার হলো মানুষ এবং শিম্পাঞ্জি, গরিলা ও ওরাংওটাংয়ের মতো বানর জাতীয় বিভিন্ন বন্য প্রাণী। ইবোলা কোনো বায়ুবাহিত রোগ নয় বলে এটি বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে পারে না। মূলত আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণীর রক্ত, লালা, ঘাম, বমি, মলমূত্র বা অন্যান্য শারীরিক তরলের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে এলেই এই ভাইরাস একজন সুস্থ মানুষের শরীরে প্রবেশ করে।

 

আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সুঁই, কাপড় বা বিছানাপত্র থেকেও এটি দ্রুত সংক্রমিত হতে পারে। এমনকি মৃতদেহের সরাসরি সংস্পর্শ থেকে, বিশেষ করে অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানের সময় ভাইরাসটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে।

 

বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ফলখেকো বাদুড় ইবোলা ভাইরাসের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক বাহক। বাদুড় নিজে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ না হলেও, এটি ভাইরাস বহন করে। এছাড়া বনমানুষ, হরিণ ও সজারুও এই ভাইরাস বহন করে মানুষের সংস্পর্শে এলে তা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সক্ষম।

 

ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে হঠাৎ করে তীব্র জ্বর আসা এবং তার সঙ্গে প্রচণ্ড শারীরিক ক্লান্তি ও দুর্বলতা অনুভব করা। পর্যায়ক্রমে রোগীর মাথাব্যথা, গলাব্যথা, মাংসপেশিতে তীব্র যন্ত্রণা, ডায়রিয়া ও বমির মতো উপসর্গ দেখা দেয়।

 

অনেক ক্ষেত্রে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ফুসকুড়ি ওঠে এবং যকৃৎ ও কিডনির স্বাভাবিক কার্যকারিতা দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। রোগের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে ভয়ংকর পর্যায়ে রোগীর নাক, মুখ কিংবা মলদ্বার দিয়ে তীব্র মাত্রায় অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ শুরু হয়।

 

সাধারণত ভাইরাস শরীরে প্রবেশের দ্বিতীয় দিন থেকেই এই উপসর্গগুলো প্রকাশ পেতে থাকে। এই অব্যাহত রক্তক্ষরণের কারণে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইবোলাকে রক্তক্ষরণমূলক জ্বর হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়। অন্যান্য ভাইরাসের তুলনায় ইবোলা কম সংক্রামক হলেও এর মৃত্যুর হার অত্যন্ত ভয়ংকর।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গড়ে ইবোলায় মৃত্যুর হার ৫০ শতাংশ হলেও কঙ্গোর সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে এই হার ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়েছে। ইতিহাস বলছে, বিগত পঞ্চাশ বছরে আফ্রিকা মহাদেশে এই মারণব্যাধিতে অন্তত পনেরো হাজারেরও বেশি মানুষের করুণ মৃত্যু হয়েছে।

 

- এএফপি